• ‘এটাই সঠিক সময়’, আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ মেসি অধ্যায়
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ফুটবল মাঠে আরও অনেক দিন তাঁকে দেখতে চায় বিশ্ব। আর্জেন্তিনার জার্সিতে আরও একবার তাঁকে দেখতে চায় কোটি কোটি সমর্থক। কিন্তু ভক্তদের সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিলেন লিওনেল মেসি (Lionel Messi) নিজেই। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন আর্জেন্তিনার মহাতারকা। ২০ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে ২০৭টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ২০০৫ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক। তার পর একের পর এক কঠিন সময় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়। সঙ্গে দু’টি কোপা আমেরিকা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির গল্পে তাই শুধু সাফল্য নেই, আছে দীর্ঘ লড়াই, হতাশা, কান্না, অপেক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্নপূরণের আনন্দ। সেই গল্পেরই এ বার শেষ অধ্যায়।

    ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালের পর বেশ কিছুটা সময় নীরবে নিজের সঙ্গে লড়াই করেছেন মেসি। শেষ পর্যন্ত হৃদয়ে জমে থাকা কথাগুলি জানালেন সমর্থকদের। অবসরের সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কলমেও ধরা পড়েছে সেই আবেগ। ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করা পোস্টে মেসি লিখেছেন, ‘ফাইনালের পর এতটা সময় কেটে গিয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত সবাইকে জানাতে চাই, আমি আর্জেন্তিনা জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি। সিদ্ধান্তটা নিতে খুব কষ্ট হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, এটাই সঠিক সময়।’

    মেসির আর্জেন্তিনা-যাত্রার একটা বড় অংশ কেটেছে অপেক্ষায়। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় ট্রফি জিততে তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপের একাধিক ফাইনালে হার, সমালোচনা— সবই এসেছে তাঁর পথে। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সির প্রতি ভালোবাসা কখনও কমেনি। বরং সেই কঠিন সময়গুলিই তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

    বিদায়বার্তায় সেই লড়াইয়ের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন মেসি। তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমি সব সময়ে নিজের সব টুকু উজাড় করে দিয়েছি। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে, যখন আমরা সব কিছু জিতেছি, শুধু তখন নয়— তার আগেও এই জার্সির জন্য আমি সব সময় লড়াই করেছি। মাঠে নিজের সবটুকু দিয়ে দিয়েছি। আপনাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আর্জেন্তাইন হওয়ার জন্য গর্বিত করে তুলতেই আমি সব সময়ে চেষ্টা করেছি।’

    একটা সময় জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। সেই মেসিই পরে আর্জেন্তিনাকে কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। তাই বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেই জার্সি এবং সমর্থকদের ভালোবাসা।

    জাতীয় দলের হয়ে খেলা মেসির কাছে শুধুমাত্র পেশা ছিল না। এই জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর আবেগ, পরিচয় এবং জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তাই বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছে সেই ভালোবাসার কথাই। মেসি লিখেছেন, ‘সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একের পর এক অধ্যায় শেষ হয়ে আসছে। আর এই অধ্যায়টা শেষ করতে গিয়ে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। জাতীয় দলের হয়ে খেলতে আমি ভালোবাসি, ভালোবেসেছি এবং চিরকাল ভালোবাসব।’

    তবে আবেগের পাশাপাশি নিজের সিদ্ধান্তের বাস্তব কারণও জানিয়েছেন আর্জেন্তিনার অধিনায়ক। তাঁর জায়গা নেওয়ার জন্য নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। তাঁদের জন্য দরজা খুলে দেওয়ার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন মেসি। তাঁর দাবি, ‘আমি নিজেকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিয়েছি। দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পাশাপাশি, আমাদের পরের প্রজন্মে দুর্দান্ত কিছু তরুণ ফুটবলার উঠে আসছে, যারা জাতীয় দলে থাকার যোগ্য।’

    এই কয়েকটি বাক্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে মেসির সিদ্ধান্তের আসল কারণ। তিনি জানেন, তাঁর চলে যাওয়া মানে একটা যুগের শেষ। আবার একই সঙ্গে এটাও জানেন, আর্জেন্তিনার ফুটবলের ভবিষ্যৎ থেমে থাকবে না। নতুনরা আসবে, নতুন স্বপ্ন দেখবে, নতুন করে এই জার্সির জন্য লড়বে।

    মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষে তাই কোনও আক্ষেপ নেই, বরং রয়েছে কৃতজ্ঞতা। যে সমর্থকরা এত বছর তাঁর পাশে থেকেছেন, তাঁদের কথা ভুলতে পারেননি তিনি। মাঠের ভিতর থেকে পাওয়া সেই সমর্থনকে খুব মিস করবেন বলেও জানিয়েছেন মেসি। তাঁর কথায়, ‘২০ বছর ধরে ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ। এখন থেকে বাইরে থেকে আপনাদেরই একজন হয়ে আর্জেন্তিনাকে সমর্থন করব।’

    পরিবারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি। দীর্ঘ এবং কঠিন ফুটবলযাত্রায় পরিবারের পাশে থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, তাঁদের সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি এবং জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলি সব সময়ে তাঁর সঙ্গে থাকবে। এর পরেই বিদায়বার্তার সবচেয়ে আবেগঘন অংশ। যে স্বপ্নের জন্য এত বছর অপেক্ষা, এত লড়াই, শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন মেসি। সেই তৃপ্তিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়। তিনি লিখেছেন, ‘মনের মধ্যে শান্তি এবং গর্ব নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের সঙ্গে এই স্বপ্নের মুহূর্তগুলো বেঁচে থাকাটা ছিল অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। আপনাদের ভালোবাসি!’

    তবে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেননি মেসি। তিনি জানিয়েছেন, ফাইনালের দু’দিন পর, ২১ জুলাই এই বিদায়বার্তা লিখেছিলেন। বাবাকে হারানোর পর নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও নিশ্চিত হয়েছেন তিনি।

    যে ছেলেটি একদিন আর্জেন্তিনার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা শুরু করেছিলেন, দুই দশক পর সেই মেসিই আবেগভরা বিদায় জানাচ্ছেন সেই জার্সিকে। এই দীর্ঘ যাত্রায় এসেছে হার, হতাশা, সমালোচনা আর কান্না। আবার এসেছে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব এবং কোটি সমর্থকের অফুরন্ত ভালোবাসা। তাই মেসির বিদায় শুধু একজন কিংবদন্তির অবসর নয়, আর্জেন্তিনার ফুটবলের এক গৌরবময় অধ্যায়েরও সমাপ্তি।

  • Link to this news (এই সময়)