• ইরান যুদ্ধ, ‘শুল্কবাণে’ও কাবু নয়! উত্তাল বিশ্বে কোন শক্তিতে বাড়ল ভারতের জিডিপি?
    প্রতিদিন | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শুল্কবাণ’, অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম। একের পর এক ধাক্কার পরও কাবু নয় দেশের অর্থনীতি। সোমবার অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি বৃদ্ধি ৭.৮ শতাংশ, যা সব প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছে।

    কিন্তু এই উত্তাল বিশ্বে কোন শক্তির বলে বাড়ল ভারতের জিডিপি? প্রথমত, জিএসটি সংস্কার। গত বছর থেকে নতুন জিএসটি-র হার কার্যকর হয়েছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কর কাঠামোকে সরল করা। ১২ শতাংশ এবং ২৮ শতাংশের স্ল্যাব তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জিএসটিতে কেবল ৫ শতাংশ এবং ১৮ শতাংশের স্ল্যাব রয়েছে। ১২ শতাংশ করের আওতায় থাকা পণ্য ও পরিষেবাগুলিকে ৫ শতাংশ ও ১৮ শতাংশের শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়নি।

    দ্বিতীয়, সুরক্ষিত ঘরোয়া বাজার। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে বন্ধ হয়ে যায় ‘তৈল ধমনী’ হরমুজ প্রণালী। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হলেও ভারতে তার আঁচ সেভাবে পড়েনি। যুদ্ধের আগুনেও শক্তিশালী ছিল ভারতের জ্বালানি ভাণ্ডার। একইসঙ্গে বিশ্বে চরম উত্তেজনার মাঝেও ভারতে সার আমদানিতে বড় কোনও বিপর্যয় ঘটেনি। সরকার অত্যন্ত সক্রিয় ও কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের কৃষকদের জন্য সারের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল ছিল।

    তৃতীয়ত, গাড়ি শিল্প। ভারতের গাড়ি শিল্পের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে। এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে দেশে যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে গড়ে ২৫.৯ শতাংশ। পূর্ববর্তী ত্রৈমাসিকে এই সংখ্যাটা ছিল  ১৩.১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি। সুতরাং, অশান্ত বিশ্বেও ধাক্কা খায়নি ভারতের গাড়ি শিল্প। সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে দেশের গাড়ি শিল্পের বাজার ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পার করতে পারে। শুধু তাই নয়, ভারতে আরও বাড়বে বৈদ্যুতিন গাড়ির সংখ্যাও।

    চতুর্থত, পরিষেবা ক্ষেত্র। ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির নেপথ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে দেশের পরিষেবা ক্ষেত্রের (বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশ পূরণ করছে পরিষেবা ক্ষেত্র)। এগুলি হল – ব্যাঙ্ক, টেলিকম, রিয়েল এস্টেট, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি। পরিষেবা ক্ষেত্রের সুবিধা হল এগুলি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল নয়। ফলে দেশের বাজারে এই ক্ষেত্রের চাকা স্লথ হয় না। তাই দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে পরিষেবা ক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    পঞ্চমত, মূলধনী ব্যয়। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে মূলধনী ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মূলধনী ব্যয় ছিল ১১.২১ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে তা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২.২২ লক্ষ কোটি টাকা। সড়ক, হাইওয়ে, রেল-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগ দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করেছে। এর জেরে দেশীয় বাজারে কাঁচামালের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানও, যার ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে ভারতের জিডিপি।

    বলে রাখা ভালো, অর্থনীতি একটি জীবন্ত সত্তার মতো, যা প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়। ২০১১ সালে ভারতের বাজারে স্মার্টফোনের রমরমা ছিল না, ফাইভ-জি ইন্টারনেট ছিল কল্পবিজ্ঞানের মতো, আর ঘরে বসে অনলাইনে পণ্য কেনা ছিল বিলাসিতা। গত এক দশকে জিএসটি চালু হয়েছে, ‘ইউপিআই’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্টে বিপ্লব এসেছে এবং পরিষেবা খাত বা সার্ভিস সেক্টরের গুরুত্ব আকাশচুম্বী হয়েছে। এভাবেই প্রতিবারই নতুন নতুন ফ্যাক্টর যুক্ত হতে থাকে। এবার যেমন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। আর সেই কারণেই আশঙ্কা ছিল, হয়তো এর ফলে জিডিপি বৃদ্ধি বড় ধাক্কা খাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা হয়নি, যা স্বস্তি দিচ্ছে অর্থনীতিবিদদের। 
  • Link to this news (প্রতিদিন)