• ‘বাবার মৃত্যু নতুন করে ভাবায়...’, অবসরের খোলা চিঠি আগেই লিখে ফেলেছিলেন মেসি
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • যে রাতটা মেসির জন্য বিশ্বকাপ জয়ের রাত হওয়ার কথা ছিল, সেই রাতই শেষ পর্যন্ত হয়ে রইল বিদায়ের রাত। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হার। ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার যন্ত্রণা। আর সেই হারের পর আর্জেন্তিনার (Argentina) জার্সিতে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসির (Lionel Messi) চোখের জল। তখনও কেউ জানতেন না, ওই কান্নার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় এক সত্যি। সেটিই ছিল জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর শেষ ম্যাচ।

    তবে সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছিল আরও নিঃশব্দে। ফাইনালের দু’দিন পর, ২১ জুলাই, মেসি নিজের বিদায়বার্তা লিখে ফেলেছিলেন। অর্থাৎ, শেষ ম্যাচের পর আবেগের বশে নয়, ঠান্ডা মাথাতেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এর পর বাবাকে হারানোর গভীর শোক সেই সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে দেয়। তাই মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় কোনও আচমকা সিদ্ধান্ত নয়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে পথের প্রতিটি বাঁকে ছিল স্বপ্ন, ব্যর্থতা, কান্না, লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের তৃপ্তি— সেই দীর্ঘ পথের শেষেই এসে দাঁড়িয়েছিল এই বিদায়।

    আর্জেন্তিনার হয়ে মেসির পথচলা কখনও সহজ ছিল না। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়েও জাতীয় দলের জার্সিতে প্রথম বড় ট্রফির জন্য তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। একের পর এক ফাইনালে হার, তীব্র সমালোচনা, ট্রফি জিততে না পারার কটাক্ষ— সব কিছুই তাঁকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একটা সময় এমনও এসেছিল, যখন জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছিল।

    কিন্তু মেসি থামেননি। ফিরে এসেছেন বারবার। আবার স্বপ্ন দেখেছেন। আর সেই অপেক্ষার শেষ হয় ২০২১ সালে। ব্রাজ়িলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্তিনা। জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় ট্রফি হাতে তুলে মেসি যেন বহু বছরের জমে থাকা কান্নার জবাব দিয়েছিলেন।

    তার পর ২০২২। যে ট্রফির জন্য তাঁর কেরিয়ারকে বারবার অপূর্ণ বলা হয়েছিল, সেই বিশ্বকাপই ওঠে মেসির হাতে। ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্তিনা। যে মেসিকে একটা সময়ে জাতীয় দলের ব্যর্থতার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হত, তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে বড় গর্ব।

    ২০২৪ সালে আরও এক বার কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্তিনা। যে মেসির চোখ একটা সময়ে বারবার ভিজেছে ফাইনালে হারের যন্ত্রণায়, সেই চোখেই তখন সাফল্যের আনন্দ। দীর্ঘ অপেক্ষা আর হতাশার জায়গা জুড়ে বসে গর্ব। মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের গল্পও তত দিনে আর অপূর্ণতার ছিল না— জয়ের আলোয় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁর দীর্ঘ লড়াই।

    ২০২৬ বিশ্বকাপই মেসির আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের শেষ অধ্যায় হয়ে দাঁড়াল। স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনাল। শেষ বার আর্জেন্তিনার জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামা। আর সেই শেষ ম্যাচেই ১-০ গোলে হার। বাঁশি বাজার পর মেসির চোখের জল আটকাতে পারেননি। বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ ছবিটা তাই ট্রফি হাতে নয়, পরাজয়ের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিংবদন্তির।

    তবু সেই এক রাত তাঁর দুই দশকের ইতিহাসকে মুছে দিতে পারে না। আর্জেন্তিনার হয়ে ২০৭টি ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড তাঁর। দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলও তাঁর নামের পাশে। দু’টি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ— আর্জেন্তিনার জার্সিতে তাঁর অর্জনের তালিকাই বলে দেয়, কতটা সাফল্যে মোড়া তাঁর গল্প।

    অবসরের সিদ্ধান্ত কিন্তু মেসি আচমকা নেননি। নিজের বিদায়ের কথা তিনি ভেবেছিলেন বিশ্বকাপ ফাইনালের পরেই। জানিয়েছেন, ফাইনালের মাত্র দু’দিন পর, ২১ জুলাই তিনি বিদায়বার্তা লিখেছিলেন। কিন্তু তার পরেই আসে আরও বড় ব্যক্তিগত আঘাত— বাবার মৃত্যু। সেই শোকের মধ্যেই নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আরও নিশ্চিত হয়ে যান মেসি। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট, এই বিদায় কোনও মুহূর্তের আবেগে নেওয়া নয়। বরং অনেক ভেবে, অনেকটা পথ পেরিয়ে নেওয়া এক কঠিন সিদ্ধান্ত।

    মেসি ইনস্টাগ্রামে তাঁর অবসর ঘোষণার পোস্টে লিখেছেন, ‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই, ফাইনালের দু’দিন পর লিখেছিলাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটাই হয়তো সঠিক সময়। কিন্তু বাবাকে নিয়ে যা ঘটেছে, তার পর আমি আগের থেকেও বেশি নিশ্চিত হয়ে যাই যে, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। বাবাকে হারানোর এই শোক আমাকে অনেক কিছু নতুন করে ভাবিয়েছে। আর্জেন্তিনার জার্সিতে এত বছর যে পথ পেরিয়েছি, তার প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে বিশেষ। অনেক কিছু পেয়েছি, অনেক কিছু হারিয়েছি, অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই অধ্যায়টাকে এখানেই থামানোই সঠিক।’

    একদিন যে তরুণ আর্জেন্তিনার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেছিলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় পর সেই জার্সিই তুলে রাখলেন তিনি। মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে ছিল হার, অপমান, সমালোচনা, চোখের জল। ছিল অপেক্ষা। আবার ছিল কোপা আমেরিকা জয়, ছিল বিশ্বকাপ জয়, ছিল কোটি সমর্থকের উচ্ছ্বাস।

    আর তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মেসির চোখের জল শুধু একটি ম্যাচ হারের কান্না ছিল না। সেখানে মিশে ছিল দুই দশকের স্মৃতি, অগণিত লড়াই, জয়ের আনন্দ, হারের যন্ত্রণা এবং শেষ পর্যন্ত একটি যুগকে বিদায় জানানোর বেদনা।

  • Link to this news (এই সময়)