সব্যসাচী ঘোষ ও রনি চৌধুরী
নেপালের মতো উত্তরবঙ্গেও পাহাড় এবং পাহাড়ি নদী রয়েছে। আর রয়েছে নদীর চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা রেস্তোরাঁ, হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টে। শেষ দু'দশকে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নদীর একেবারে গা ঘেঁষে কিংবা নদীর উপরেই যে ভাবে নির্মাণকাজ হয়েছে, তাতে এই বিস্তীর্ণ জনপদে নেপালের মতো ঘটনা ঘটতে বেশি সময় লাগবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশপ্রেমীরা। অভিযোগ, সব জেনেও প্রশাসন 'গান্ধারীর' ভূমিকা পালন করে এসেছে। সমস্তটাই চলেছে উন্নয়ন এবং পর্যটন বিকাশের নাম করে।
পাহাড়ি নদী, সাদা সফেন জল (ফ্যানা ছড়ানো) পাথরের গা বেয়ে নেমে আসছে। যেন শিল্পীর তুলির টানে সবুজ পাহাড় থেকে নেমে আসা মুক্তোর মতো জলের ধারা। আগে পর্যটকরা পাহাড়ি নদীর এই সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করতে মূলত দিনেরবেলায় আসতেন। বর্তমানে পর্যটনের প্রতিযোগিতায় সেই সব সাইট সিইং-এর জায়গাগুলি দখল করে নদীর গা ঘেঁষে তৈরি হয়েছে রিসর্ট, কটেজ, হোমস্টে। তার বারান্দা বা ব্যালকনি থেকে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ হাতে পাহাড়ি নদীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি হওয়ার 'লোভ' সংবরণ করা যায় না।
কিন্তু সেই, তা কি এখনও বোঝা যাচ্ছে না? গত কয়েক বছরে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলায় অসংখ্য নদীর ধারে এমন হাজার হাজার হোটেল, রেস্তোরাঁ, হোমস্টে, রিসর্ট গজিয়ে উঠেছে। তিস্তা, বালাসন, রঙ্গিত, জলঢাকা, তোর্সা, মুর্তি, নেওরা, চিতাংখোলা, রেলি, বাঙরি কোনও পাহাড়ি নদী বাদ নেই। আলিপুরদুয়ারের জয়গাঁ, কালচিনি, মাদারিহাট থেকে জলপাইগুড়ির চম্পাগুড়ি, সুলকাপাড়া, মাটিয়ালি হাট, ইনডং, সামসিং।
দার্জিলিংয়ের পানিঘাটা, দুধিয়া থেকে কালিম্পংয়ের গোরুবাথান, রকি আইল্যান্ড, ঝালং, রঙ্গু, বিন্দু, তোদে, ফাগু, লাভা, পেডং। সর্বত্র একই দৃশ্য! এমনকী, ডুয়ার্স এবং দার্জিলিং পাহাড়ের পাদদেশে বহু নদীর উপরেই 'খাও খাও বুঁদ হয়ে জলে পা-ডুবিয়ে বসে খানাপিনার ব্যবস্থা দেখলে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। নেপালের মতো ভয়াবহ হড়পা বান এলে কিংবা অতিভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি নদীগুলি ফুলেফেঁপে উঠলে এই পর্যটনকেন্দ্রগুলি কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে গিয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
উত্তরের নদী বিশেষজ্ঞ দেবর্ষি ঘোষ বলছেন, 'পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেই নদীর ধার নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া যায় না। এই নদীগুলি মূলত খরস্রোতা। পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলে যে কোনও সময়ে হড়পা বান হতে পারে। নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়তে পারে। তাই নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার মধ্যে নির্মাণ কতটা নিরাপদ, তা বৈজ্ঞানিক ভাবে খতিয়ে দেখে তার পরেই অনুমতি দেওয়া উচিত।' কিন্তু অনুমতির তোয়াক্কা করে কে? অভিযোগ, এই সমস্ত হোটেল, রিসর্ট, হোমস্টেগুলি গড়ে উঠেছে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না-করেই।
পরিবেশবিদ নফসর আলির বক্তব্য, 'নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে উঠতেই পারে। কিন্তু নদীর স্বাভাবিক গতিপথ এবং বিপদসীমাকে উপেক্ষা করে নির্মাণ হলে ভবিষ্যতে তার ফল ভয়াবহ হবে। পর্যটনের পাশাপাশি নদীর পরিবেশ এবং মানুষের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী, নদী থেকে ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও নির্মাণকাজ করা যায় না। তার পরেও নদীর গায়ে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নেপালের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত প্রশাসনের।'
পর্যটনের ক্ষেত্রে নির্মাণ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন আদালতে সওয়াল করেছেন আইনজীবী সুভাষ দত্ত। তাঁর মতে, 'রেসপন্সিবল ট্যুরিজম পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্ন যে, নিজেদের দেশে গড়ে তুলতে পারিনি। নদী আপন বেগে পাগলপারা- এই লাইনটা সবাই জানলেও মর্মার্থ আমরা বুঝিনি। তাই নেপালে যা হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা না-নিলে নদীর গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রগুলি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যেতে পারে।'
উত্তরবঙ্গ-সহ আন্তজাতিক স্তরের পর্যটন পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে জড়িত সংগঠন 'অ্যাক্ট'-এর পক্ষে তন্নিষ্ঠা রক্ষিত বলেন, 'কী করে এসব নির্মাণ হয়ে গেল, তা ভাবলেই অবাক লাগে। কোনও যুক্তি-তর্কে না-গিয়ে ১০০ শতাংশ সবই অবৈধ এবং পরিবেশ-বিরোধী।' তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নেপালের মতো পরিস্থিতি যে উত্তরবঙ্গেও তৈরি হতে পারে, তার ঝলক কিন্তু গতবছর অক্টোবরেই দেখা গিয়েছে। তন্নিষ্ঠার কথায়, 'এই যাবতীয় অবৈধ নির্মাণের তালিকা প্রস্তুত করে আমরা নতুন নির্দেশিকা তৈরির কাজ করছি। মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এ নিয়ে রাজ্যের পর্যনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, 'পর্যটন দপ্তরের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য জেলাশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা দেওয়া হবে। এই ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'