• চলন্ত বাসে ফের গণধর্ষণ, ২৭ দিন বাদে মুখ খুলল পুলিশ
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • নয়াদিল্লি: ফের নাম জড়াল দিল্লির, আরও একবার ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র’ চলন্ত বাস, তার চালক–কন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন জানলার পর্দা। যার আড়ালে চলন্ত বাসে গত ৪ অগস্ট গ্রেটার নয়ডায় এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ করা হয় প্রায় ৪৩ কিলোমিটার (অন্য সূত্রে দাবি, ৪৭ কিমি) পথ জুড়ে। এই ঘটনায় ২০১২–র নির্ভয়া কাণ্ডের ছায়া তো স্পষ্টই, পাশাপাশি গত ১৪ বছরে যে রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায় মেয়েদের নিরাপত্তা সে ভাবে নিশ্চিত হয়নি, তা–ও বেআব্রু হয়ে গিয়েছে বলে সরব নানা ক্ষেত্রের মানুষ। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কেন্দ্র, দিল্লি বা উত্তরপ্রদেশ সরকারের তরফে সোমবার রাত পর্যন্ত কোনও বিবৃতি সামনে না এলেও বিজেপি সাংসদ নবনীত রানা সকলের সামনে দোষীদের ফাঁসির দাবিতে সুর চড়িয়েছেন।

    ঘটনাটি গত মাসের গোড়ার দিকে ঘটলেও পুলিশ মুখ খুলেছে সোমবার। দিল্লি নর্থের ডিসিপি এ দিন জানা‍ন, ঘটনার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তিমারপুরের একটি বাস পার্কিং লটের কাছ থেকে দুই অভিযুক্ত, চালক কুলদীপ এবং কন্ডাক্টর সন্দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা কানপুরের বাসিন্দা। বাসটিকে বাজেয়াপ্ত করে ফরেন্সিক পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে।

    উত্তরপ্রদেশের মৈনপুরীর একটি স্কুলের একাদশ শ্রেণির নিগৃহীতা ছাত্রীর বয়স বছর ষোলো। মন দিয়ে লেখাপড়া না–করায় ঘটনার দিন মা তাকে বকাবকি করেছিলেন, মেয়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটিও হয় তাঁর। এর পরে বাড়িতে কিছু না জানিয়ে মৈনপুরী থেকে নয়ডার সেক্টর ৬৩–তে এক তুতো বোনের বাড়ির দিকে রওনা হয় নাবালিকা। প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার যাওয়ার পরে ভারী বৃষ্টি ও অন্ধকারের মধ্যে ঠাহর করতে না–পেরে রাত ন’টা নাগাদ গ্রেটার নয়ডার পরী চক এলাকায় নেমে পড়ে সে। পরী চক থেকে ওই আত্মীয়ের বাড়ি আরও অন্তত ২৫ কিলোমিটার। এ দিকে মুষলধারে বৃষ্টি, রাস্তায় লোকজন কার্যত নেই।

    ভিজে চুপচুপে হয়ে মেয়েটি দেখে, ওই রুটে একটি বাস আসছে। নাবালিকাকে দেখে বাস থামিয়ে বছর ২৬–এর সন্দীপ জানতে চায়, সে কোথায় যাবে? নয়ডার সেক্টর ৬৩ শুনে জানায়, বাসও ওই দিকেই যাবে, পথে তাকে নামিয়ে দেবে। সন্দীপের আশ্বাসে বাসটিতে ওঠার পরে কিশোরী দেখে, আর কোনও যাত্রী সেখানে নেই। দূরপাল্লার যাত্রিবাহী স্লিপার বাসের জানলায় মোটা পর্দা। এফআইআরে নির্যাতিতা জানিয়েছে, স্টার্ট দেওয়ার পরেই কন্ডাক্টর তাকে উদ্দেশ করে অশালীন ইঙ্গিত করতে থাকে। এর পরে চালক ও কন্ডাক্টর মিলে তাকে ধর্ষণ করে। বাধা দিলে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এ ভাবে সেক্টর ৬৩–র একদম উল্টো রাস্তায় প্রায় ৪৩ কিলোমিটার গিয়ে কাশ্মীরি গেটের কাছে রিং রোড এলাকায় নির্যাতিতাকে ফেলে বাস নিয়ে চম্পট দেয় দুই অভিযুক্ত।

    ওই অবস্থাতেও একটি অটোরিকশা নিয়ে কাশ্মীরি গেট পুলিশের কাছে গিয়ে মেয়েটি অভিযোগ জানায় বলে খবর। ‘বিশ্বনাথ ট্রাভেলস’ নামে একটি বেসরকারি ভ্রমণ সংস্থার স্লিপার বাসটিকে ট্র্যাক ও বাজেয়াপ্ত করেন তদন্তকারীরা। পরে সন্দীপ এবং ৪০ ছুঁইছুঁই কুলদীপকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জনেই বছর দুয়েক ধরে ওই সংস্থায় কাজ করছিল। সূত্রের খবর, সে দিন গ্রেটার নয়ডার সুরজপুরের একটি ওয়ার্কশপ থেকে বাসের সার্ভিসিং করিয়ে ফেরার পথে ওই কাণ্ড করে দুই অভিযুক্ত।

    পুলিশ জানায়, মেয়েটির মেডিক্যাল পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ মিলেছে। বাসের ভিতর থেকে তার চুলও পেয়েছেন তদন্তকারী। যে পথে বাস নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেখানে একাধিক ব্যারিকেড, পুলিশ পোস্ট রয়েছে। তা সত্ত্বেও কী ভাবে অতটা রাস্তায় দু’জন মিলে গণধর্ষণ চালাল, সেটা ভাবাচ্ছে তদন্তকারীদের। এই সূত্রেই গুরুত্ব পাচ্ছে বাসের জানলায় টাঙানো পর্দা। বৃষ্টির মধ্যে যার আড়ালে কুকর্ম চালাতে অভিযুক্তদের সুবিধে হয়েছে বলে অনুমান।

    কিন্তু ৪ তারিখের ঘটনা ৩১ তারিখ সামনে আনা হলো কেন? কিছু কি চেপে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সোমবার রাত পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। ঘটনা নিয়ে দিল্লি সরকারকে নোটিস পাঠিয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। নিগৃহীতাকে পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি। অভিযুক্তরা আপাতত জেল হেফাজতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং পকসো অ্যাক্টের নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।

    নির্ভয়ার ঘটনার পরে রাজধানী–সহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক সিদ্ধান্ত হয়, যার কিছু কার্যকরও হয়েছে। তার উপরে মহিলাদের নিরাপত্তা, সম্মান নিয়ে নিজেদের তৎপরতার কথা লাগাতার প্রচার করে বিজেপি। কিন্তু ‘ফুলপ্রুফ’ কোনও ব্যবস্থা যে করা যায়নি, এই ঘটনা সেটাই দেখাল বলে অনেকের অভিযোগ।

    দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)–র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে যেমন বলেন, ‘গুরুতর অপরাধের সময়ে দিল্লি পুলিশের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু যুব–সমাজের উপরে অত্যাচার চালানোর সময়ে (সিজেপির সংসদ চলো অভিযান ঘিরে) তারা ঠিক মাঠে নেমে পড়ে।’ উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লি পুলিশের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে এক্স হ্যান্ডলে কংগ্রেসের পোস্ট — ‘কোনও টহলদারি, নজরদারি নেই। এই ঘটনা শুধু নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না, এখানে অপরাধীরা যে আইনের তোয়াক্কা করে না, তা–ও বুঝিয়ে দেয়।’ আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ আবার দিল্লিকে ‘শিশু ধর্ষণের রাজধানী’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর দাবি, এমন ঘটনায় দিল্লির রেখা গুপ্তা সরকারের আচরণ ‘অত্যন্ত অসংবেদশীল এবং জঘন্য’।

    ঘটনার নিন্দে করে কড়া বার্তা দিয়েছেন বিজেপি সাংসদ নবনীতও। তাঁর কথায়, ‘এ ধরনের কাণ্ড যে ঘটেই চলেছে, তাতে মহিলা হিসেবে আমি মর্মাহত। দীর্ঘ শুনানিতে সময় নষ্ট, বিশেষ ফাস্ট–ট্র্যাক কোর্ট তৈরি — কিচ্ছু চাই না। দ্রুত শুনানি করে প্রকাশ্য রাস্তায় দোষীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হোক।’

  • Link to this news (এই সময়)