• মাংস ঢোকে না গ্রামে, হরিতকির ছায়ায় ৫০০ বছরের বিশ্বাস, কাঞ্চনগড়িয়ায় ‘বেঁচে’ চৈতন্যের স্মৃতি
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • শুভাশিস সৈয়দ

    মাথায় ঘোমটা। কোলে বছর ছয়েকের বাচ্চা। হনহন করে পা ফেলে হাঁটছেন শ্যামলী জানা। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন গ্রামের আরও অনেকে। কারও কাঁধে চালের বস্তা, কারও হাতে তোলা উনুন, হাঁড়ি। কারও মাথায় আবার দিস্তে দিস্তে কাটা কলাপাতা। সরু মেঠো পথ ধরে চলেছে বাহিনী ।

    দুপুর হব হব করছে। মাথার উপরে গনগনে রোদ। কিন্তু কারও ক্লান্তি নেই। সবার মুখে হাসি। কী ব্যাপার? লাল জামা আর নীল রঙের প্যান্ট পরে হাঁটছিল বছর বারোর ছোটন। প্রশ্ন শুনে হাসি মুখে বলে উঠল, ‘আজ আমারা মাংস খাব।’ সবাই তাই গ্রামের চৌহদ্দির বাইরে যাচ্ছে। সেখানেই রান্নাবান্না হবে। তার পরে পাত পেড়ে খাওয়াদাওয়া। সন্ধ্যার আগেই যে যার ঘরে ফিরবে। কারণ, ভরতপুরের সিজগ্রাম পঞ্চায়েতের কাঞ্চনগড়িয়া গ্রামে মাংস ঢোকা নিষেধ।

    বাংলার গ্রামের যে পরিচিত ছবি হয়, কাঞ্চনগড়িয়া তা-ই। ধুলো ওঠা রাস্তা দিয়ে খালি পায়ে সাইকেলে হাফ প্যাডেল করতে করতে চলে যায় কোনও কিশোর। পুকুর থেকে হেলতে দুলতে রাস্তায় উঠে আসে ধবল রাজহাঁস। বাড়ির সামনে নিশ্চিন্তে বসে বসে জাবর কাটে গরু। যেমনটা হয় আর কী। গ্রামের মাঝামাঝি রাধাগোবিন্দ মন্দির। তার পাশে একটা বিশাল হরিতকি গাছ। তাকালে কেমন যেন সম্ভ্রম জাগে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গাছের বীজ দিয়েছিলেন স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। এই গ্রামে এসেছিলেন তিনি। তার পর থেকে আর মাংস খায় না কেউ।

    সেটা ৯১৬ বঙ্গাব্দ। ওডিশা যাচ্ছেন চৈতন্যদেব। জগন্নাথ দর্শন করবেন। লীলা হবে। তাঁর সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন ভক্তরা। দল ক্রমশ ভারী হচ্ছে। পথে কাঞ্চনগড়িয়ায় থামলেন তিনি। একটু বিশ্রাম নেবেন। সবাই মিলে এসে উঠলেন রাধাগোবিন্দ মন্দিরে। বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে চৈতন্য ভাবাবিষ্ট। নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো করলেন। তার পরে খেতে বসলেন নিজে। ততক্ষণে গোটা গ্রামে সেই খবর রটে গিয়েছে। চৈতন্যকে দেখতে দলে দলে ভিড় জমিয়েছেন সবাই।

    মুণ্ডিত মস্তক। পরনে গেরুয়া। গলায় একটা উড়নি। সাদা যজ্ঞোপবীত দেখা যাচ্ছে। মুখ নীচু করে খাচ্ছেন শ্রীচৈতন্য। পাতে হেলেঞ্চা শাক, ডাল, আলুসেদ্ধ আর পায়েস। সামনে জোড় হাতে বসে আছেন ভক্তরা। দু’চোখ ভরে দেখছেন প্রভুকে। আহার শেষে ভক্তদের হাতে একটা করে হরিতকি তুলে দিলেন চৈতন্য। ওটা মুখশুদ্ধি। আর দ্বিজহরি দাসকে দিলেন একটি হরিতকির বীজ। মন্দিরের ঈশান কোণে সেটি পোঁতা হয়। সেই হরিতকি আজ মহীরূহ। তার পর থেকে মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন গ্রামবাসীরা।

    কাঞ্চনগড়িয়ায় সত্যিই কোনও দিন চৈতন্যদেব এসেছিলেন কি না, তার পাথুরে প্রমাণ নেই। কিন্তু বিশ্বাস কবে আর প্রমাণের তোয়াক্কা করেছে। বংশ পরম্পরায় রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পুজো করছে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বর্তমানে সব দায়িত্ব বাপি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে। তিনি জোর গলায় বললেন, ‘শ্রীচৈতন্য আমাদের গ্রামে এসেছিলেন। যাওয়ার সময়ে একটি হরিতকি বীজ দান করেন। দ্বিজহরি দাস সেটি রোপণ করেছিলেন। তার পর থেকে আমরা মাছ খেলেও মাংস খাই না।’

    দ্বিজহরি দাস শ্রীচৈতন্যে একজন পারিকর বা ভক্ত। তাঁকে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বললেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি মহাভারতের অনুবাদ করেছিলেন। আবার কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের রচিয়তা হিসেবেও তাঁর নাম পাওয়া যায়। তাই বোধহয় তাঁর হাতেই হরিতকির বীজ বপনের গুরুদায়িত্ব দায়িত্ব দিয়ে যান শ্রীচৈতন্য।

    কাঞ্চনগড়িয়ায় ১১০টি পরিবারের বাস। জনসংখ্যা মেরেকেটে পৌনে চারশো। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই নিরামিষাশী। বাকিরা মাছ খান। কিন্তু মাংসে নৈব নৈব চ। বাড়িতে হয়তো আত্মীয় কিংবা নতুন জামাই এসেছেন। মুখরক্ষায় মাংস করতেই হয়। কিন্তু বাড়িতে নয়। তখন সবাই গ্রামের বাইরে যান। সেখানেই রান্নাবান্না আর খাওয়াদাওয়া করে আবার ফেরেন — তবে শুদ্ধ হয়ে। বাপির কথায়, ‘মাংস খাওয়ার পরে স্নান করতে হয়। ওই জামাকাপড় পরেও আর ঢোকা যায় না। সেগুলি কেচে দেওয়াই নিয়ম। আর হাঁড়ি-কড়া মাজতে হয় ভালো করে।’

    বৈষ্ণব-ঐতিহ্য ও পুরোনো সাহিত্যে কাঞ্চনগড়িয়ায় চৈতন্যের আগমনের কিছু সূত্র পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসের মানদণ্ডে তাকে ‘একেবারে সত্য’ বলা যায় না। ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’-য় কান্দির বৈষ্ণব ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে ভরতপুরকে বলা হয়েছে গদাধর গোস্বামীর ভ্রাতা হৃদয়ানন্দের বাসস্থান। ফলে চৈতন্যের সঙ্গে একটি যোগসূত্র থেকেই যায়।

    রামকৃষ্ণ-সারদা পরম্পরার একটি প্রকাশনায় আবার সরাসরি দাবি করা হয়েছে, কাটোয়ায় সন্ন্যাস নেওয়ার পরে চৈতন্যদেব ভরতপুরের কাশনগরিয়া গ্রামে গদাধর পণ্ডিতের বাড়িতে এসেছিলেন।

    রাধাগোবিন্দ মন্দিরে খুব যত্ন করে একটি তালপাতার পুঁথি রাখা আছে। সেটা আসলে হাতে লেখা গীতা। সেই পুঁথিতে চৈতন্যদেবের হস্তাক্ষর রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে তার প্রমাণ হয়নি। চৈতন্যর আগমন নিয়ে নিশ্চিত নন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজর্ষি চক্রবর্তীও। তাঁর কথায়, ‘চৈতন্যদেবকে নিয়ে কিছু জানতে গেলে কোথায় যাব? চৈতন্যভাগবত বা চৈতন্যচরিতামৃত। কিন্তু সেখানে এমন কিছু লেখা নেই।’ তবে এই দাবির পিছনে লোককথা বা বৈষ্ণব পরম্পরা থাকতে পারে বলে মনে হয় তাঁর।

    তবে কাঞ্চনগড়িয়া যে গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব কেন্দ্র ছিল, তার সাহিত্যিক প্রমাণ রয়েছে। ‘ভক্তিরত্নাকর’-এ এই গ্রামের সঙ্গে শ্রীনিবাস আচার্যের সম্পর্ক ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পুরোনো ভ্রমণ-সাহিত্যেও কাঞ্চনগড়িয়াকে চৈতন্যভক্ত হরিদাস আচার্যের জন্মস্থান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে চৈতন্যদেবের নিজের পায়ে গ্রামে আসার প্রত্যক্ষ বিবরণ এখনও অধরা।

    হরিতকি গাছটির বয়স প্রায় ৫০০ বছর বলে দাবি করেন অনেকে। তবে তারও কোনও প্রমাণ নেই। গ্রামের বাসিন্দা কৌশিক পাল ও মায়ারানি পাল বললেন, ‘প্রমাণ না-ই বা থাক, এই গাছের ফল আমাদের কাছে মহাপ্রসাদ। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা নিয়ে যান।’ রাধাগোবিন্দ মন্দিরে প্রতিদিন নিত্যভোগের ব্যবস্থা রয়েছে। আগে থেকে জানালে দর্শনার্থীদের প্রসাদের ব্যবস্থাও করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ।

    রবিবার বা কোনও ছুটির দিনে এলাকার সাত-আটটি গ্রামের প্রায় ৩০০ ভক্ত মন্দির চত্বরে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন। সেবাইত বাপি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘প্রসাদে থাকে সাদা ভাত, মুগ ডাল, কচুর শাক, পাঁচমিশালি তরকারি, পনির, আমড়ার টক আর পায়েস। কখনও পাঁচ রকমের ভাজাও দেওয়া হয়।’

    মন্দিরে ধুমধাম করে জন্মাষ্টমী আর রাধাষ্টমী পালন করা হয়। ফাল্গুন মাসে মহাপ্রভু হরিদাসের তিরোভাব দিবস উপলক্ষে বসে চতুর্দশী উৎসব। চার দিন ধরে চলে কীর্তন, যাত্রাপালা, কবিগান। মহোৎসবের দিন প্রায় ১৫ হাজার ভক্ত প্রসাদ খান।

    কথায় বলে, বিশ্বাসে পাহাড় টলে যায়। আর সামান্য মাংসের লোভ ছাড়া কী এমন বড় ব্যাপার। আজকের কাঞ্চনগড়িয়ার লোকজন মহাপ্রভুকে দেখেননি। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। গৌরবর্ণের একজন শাক দিয়ে ভাত খাচ্ছেন। চারদিকে মিষ্টি গন্ধ। পাখিগুলো ওড়াওড়ি ছেড়ে মন্দিরের চাতালে চুপ করে বসে আছে। কোথা থেকে যেন হরিনাম ভেসে আসছে, ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ...।’

  • Link to this news (এই সময়)