• গ্রেট নিকোবর প্রকল্প স্থগিতই রাখার সুপারিশ রাষ্ট্রপুঞ্জের! কাঠগড়ায় ভারতের আদিবাসী অধিকার আইনও
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: গ্রেট নিকোবর দ্বীপের উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রের বিপুল পরিকল্পনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ। প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার পরিকাঠামো প্রকল্পের কাজ আপাতত স্থগিত রাখার সুপারিশ করল রাষ্ট্রপুঞ্জের বর্ণবৈষম্য নির্মূল কমিটি (সিইআরডি)। প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেট নিকোবর ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলি কার্যকর না করার কথা জানানো হয়েছে ভারতকে। বিশেষ করে স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের উপরে প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে কমিটি। সিইআরডি-তে রয়েছেন ১৮ জন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। বর্ণবৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে দেশগুলির পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে এই কমিটি। ভারত ১৯৬৮–তে ওই কনভেনশন অনুমোদন করেছিল।

    গ্রেট নিকোবরের বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিকল্পিত এই মেগা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট কন্টেনার টার্মিনাল, গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, টাউনশিপ, শিল্পাঞ্চল, পর্যটন পরিকাঠামো এবং সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ। দ্বীপে বিপুল সংখ্যক মানুষের বসতি গড়ে তোলার কথাও রয়েছে। বিভিন্ন নথি ও পরিবেশবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য অন্তত ১৩০ বর্গকিলোমিটার রেনফরেস্ট নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা। এই বনভূমির সঙ্গে শম্পেন ও নিকোবারি আদিবাসীদের জীবন, জীবিকা জড়িত।

    নৃতত্ত্ববিদদের মতে, শম্পেনরা বিশ্বের অন্যতম বিচ্ছিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বাইরের সমাজের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ সীমিত। ফলে প্রকল্প নিয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ করা, এমনকী তাঁদের সম্মতি নেওয়াও সম্ভব হয়নি বলে রাষ্ট্রপুঞ্জের কমিটিকে জানিয়েছে ভারত সরকার। আন্তর্জাতিক আদিবাসী অধিকার কাঠামোয় এই সম্মতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শম্পেনদের অস্তিত্ব বিপদের মুখে পড়তে পারে—২০২৪–এ এই মর্মে সতর্ক করেছিল ৩৯ জন বিশেষজ্ঞের একটি দল।

    ২৫ অগস্ট প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে সিইআরডি জানিয়েছে, গ্রেট নিকোবর ও আন্দামানে উন্নয়ন প্রকল্পের ‘বিরূপ প্রভাব’ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

    ভারতের আদিবাসী ও বনবাসীদের অধিকার রক্ষার আইনি কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। ২০০৬–এর ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট (এফআরএ)-এর কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না—এমনটাই অভিযোগ সিইআরডি-র। তাদের বক্তব্য, আইন থাকলেও আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভাবে ব্যবহৃত জমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না।

    প্রাকৃতিক সম্পদ ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাকারী সিআর বিজয়ের মতে, এফআরএ-তে আদিবাসীদের বনাধিকার স্বীকৃত করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেই আইন মানা হচ্ছে না। ভুয়ো নথির মাধ্যমে গ্রামসভার সম্মতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে—এমনটাও জানিয়েছেন তিনি। গ্রেট নিকোবরের শম্পেন ও নিকোবারিদের বনাধিকার এখনও নিষ্পত্তি না হওয়ার পরেও প্রকল্পের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁর দাবি। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলাও চলছে।

    মে–তে হাইকোর্টে আন্দামান-নিকোবর প্রশাসন দাবি করেছিল, প্রকল্পের জন্য গ্রামসভাগুলির বৈঠক নিয়ম মেনেই হয়েছিল। যদিও সংশ্লিষ্ট গ্রামগুলির মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ থেকে ১৫ শতাংশই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন—এমন তথ্য সামনে এসেছে।

    রাষ্ট্রপুঞ্জের সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে আদিবাসী অধিকার সংগঠন ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’। সংগঠনের ডিরেক্টর ক্যারোলিন পিয়ার্সের বক্তব্য, ভারত সরকার এবং প্রকল্পে আগ্রহী কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে এই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হবে।

    রাষ্ট্রপুঞ্জের সুপারিশ অবশ্য ভালো ভাবে দেখছে না নয়াদিল্লি। প্রকল্প স্থগিতের প্রস্তাবের সমালোচনা করে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, রিপোর্টে থাকা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ’ জাতীয় শব্দগুলির উল্লেখ ভারত মানছে না।

  • Link to this news (এই সময়)