• পাহাড় বাঁচাবে ‘জীবন্ত পেরেক’, ধস রুখতে লোনাভালায় খুস ঘাসের পরীক্ষা রেলের
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢালে মাটি আলগা হয়ে নামছে ধস। কোথাও ভেসে যাচ্ছে রাস্তা, কোথাও বিপর্যস্ত হচ্ছে রেল যোগাযোগ। বদলে যাওয়া আবহাওয়ায় অতিবৃষ্টির এমন ঘটনা বাড়তেই থাকায় পাহাড়ের ঢাল বাঁচাতে এ বার কংক্রিট-ইস্পাতের পাশাপাশি ভরসা করা হচ্ছে একটি ঘাসের উপরে। নাম ভেটিভার (ক্রিসোপোগন জ়িজ়ানিওয়াইডিস)— বাংলায় এই ঘাস ‘খুস’ বা ‘বিন্না’ নামেই পরিচিত। গভীর ও ঘন শিকড়ের জন্য এই সুগন্ধি ঘাসই হয়ে উঠছে প্রাকৃতিক ভাবে জীবন্ত পেরেকের মতো মাটি আঁকড়ে ধরার এক সস্তা হাতিয়ার।

    মহারাষ্ট্রের লোনাভালা ঘাটে সেই পরীক্ষাই শুরু করেছে সেন্ট্রাল রেলওয়ে। কর্জত-লোনাভালার মধ্যবর্তী ভোরঘাট এলাকায় প্রায় ৫৬০০ বর্গমিটার ঢালে ১০ হাজার ভেটিভার চারা বসানো হয়েছে। প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি করা হচ্ছে কৃষি-ব্যবসা সংস্থা সাগুনা সাসটেনেবিলিটি সলিউশনসের সঙ্গে যৌথ ভাবে। যে রেললাইনের একটি অংশে গত ৬ জুলাই প্রবল বৃষ্টির পরে ধস নেমেছিল, সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার এবং ১৫ কিলোমিটার দূরের দু’টি ঢালু এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়েছে পরীক্ষার জন্য। মাস খানেক আগেধসের জেরে ওই অঞ্চলে ২৩ দিন ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছিল।

    কী ভাবে কাজ করবে এই ঘাস? ভেটিভারের শিকড় মাটির অনেক গভীরে গিয়ে অত্যন্ত ঘন জাল তৈরি করে। ফলে মাটির কণাগুলিকে শক্ত করে ধরে রাখে শিকড়। এই শিকড়ের টান সহ্য করার ক্ষমতা মাইল্ড স্টিলের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ বলে দাবি গবেষকদের। সেই কারণেই জিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে ভেটিভারকে বলা হয় ‘লিভিং নেল’ বা ‘জীবন্ত পেরেক’।

    শুধু মাটির নীচে নয়, উপর থেকেও ধস ঠেকাতে সাহায্য করে ভেটিভার। ঢালের সমান্তরালে ঘন করে লাগানো হলে গাছগুলি এক ধরনের প্রাকৃতিক বেড়া তৈরি করে। বৃষ্টির জল দ্রুত ঢাল বেয়ে নেমে যেতে পারে না। ফলে মাটি ধুয়ে যাওয়ার বদলে জল ধীরে ধীরে মাটির ভিতরে ঢোকার সুযোগ পায়। অর্থাৎ বৃষ্টির জল আটকানো নয়, তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করাই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির ভিতরে জলের চাপ বেড়ে গেলে ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। ভেটিভারের ঘন শিকড় সেই পরিস্থিতিতে জল নিষ্কাশনের পথ তৈরি করতে এবং মাটির স্থিতিশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

    ভারতের প্রায় ১২.৬ শতাংশ ভূখণ্ডই ভূমিধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়লে এই বিপদ আরও বাড়তে পারে। ভেটিভার নিয়ে তাই আগ্রহ বাড়ছে বিভিন্ন রাজ্যে। হিমাচল প্রদেশেও বিপজ্জনক ঢালে এই ঘাস বসিয়ে ধস আটকানোর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। দিল্লির যমুনার পাড়ে প্রায় এক লক্ষ ভেটিভার চারা ও এক হাজার গাছ লাগিয়েছে সিআইএসএফ। নেরালের একটি নার্সারিতে ভেটিভারের লক্ষ লক্ষ চারা তৈরি হচ্ছে। গবেষকদের দাবি, এই ঘাস বিভিন্ন ধরনের মাটি ও আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে, বন্যা ও খরাও সহ্য করতে পারে এবং দ্রুত পুনরায় বেড়ে ওঠে। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, ভেটিভার কংক্রিট বা অন্যান্য প্রচলিত টেকনোলজির বিকল্প নয়, বরং তার পরিপূরক ব্যবস্থা।

  • Link to this news (এই সময়)