• কুনুরের গ্রাসে ভিটেমাটি, গ্রাম ছাড়ছেন বাসিন্দারা
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়, কাটোয়া: বর্ষায় কুনুর নদীর তীব্র ভাঙনের জেরে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন মঙ্গলকোটের সরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দারা। সারা বছর শান্ত ও প্রায় স্রোতহীন থাকলেও বর্ষা নামলেই রুদ্ররূপ ধারণ করছে এই নদী। ক্রমাগত পাড়ের মাটি ধসে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে এক-একটি ঘরবাড়ি। যাঁদের অন্যত্র সরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, তাঁরা ভিটে হারানোর আতঙ্ক বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

    পশ্চিম বর্ধমানের উখড়ার কাছ থেকে উৎপন্ন হওয়া এই কুনুর নদী কাঁকসা, লাউদোহা, আউশগ্রাম ও গুসকরা পার হয়ে মঙ্গলকোটে প্রবেশ করেছে। প্রায় ১১২ কিলোমিটার গতিপথ অতিক্রম করে শেষে কোগ্রামের কাছে অজয় নদে মিশেছে এটি। নদীটি খুব বেশি প্রশস্ত নয়, তার উপরে নাব্যতাহীনতার কারণে জল ধারণ ক্ষমতা দিন দিন আশঙ্কাজনক ভাবে কমছে। ফলে বর্ষায় জল বাড়লে সংকীর্ণ পথের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ে জল তীব্র শক্তিতে নদীর পাড়ে গিয়ে ধাক্কা মারে, আর তাতেই দেখা দেয় ব্যাপক ভাঙন। বিশেষ করে গুসকরা হয়ে মঙ্গলকোটের চানক ও গোতিষ্ঠা এলাকায় নদী গতিপথ বদলে বাঁক নেওয়ায় সংলগ্ন গ্রামগুলি প্রবল ভাঙনের মুখে পড়েছে।

    সরুলিয়া গ্রামে কয়েক দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে এই নদীর ভাঙন খেলা। নদী তীরের বাড়িঘর ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ায় গত চার-পাঁচ বছরে বহু পরিবার এলাকা ছেড়েছেন। গ্রামের বিশেষ করে ঘোষপাড়া ও মাঝিপাড়ায় নদী একেবারে 'ইউ' আকৃতি ধারণ করায় ভাঙনের তীব্রতা আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।ভাঙনের জাঁতাকলে পিষ্ট স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ বাড়ছে প্রশাসনের প্রতি। সরুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ষষ্ঠী ঘোষ ও আন্না ঘোষ আক্ষেপের সুর মিলিয়ে বলেন, 'বর্ষা এলেই আমাদের আতঙ্কে থাকতে হয়। কুনুরের ভাঙন হয় ধীরে ধীরে। জল বাড়লেই পাড় ভাঙছে। এখন আমাদের বাড়ি বহু বার ভেঙেছে। নদী পাড় থেকে পিছতে পিছতে এখন অনেকটা পিছিয়ে বাড়ি করেছি। তবু নদী আমাদের ছাড়ছে না। প্রশাসনকে নদীর ধার বাঁধানোর জন্য অনেক বার জানিয়েছি। কোনও কাজ হয়নি।'

    একই অভিজ্ঞতা আর এক বাসিন্দা বাণী ঘোষের। তিনি গ্রামের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, 'নদীর ভাঙনের জন্য গ্রাম থেকে কয়েক বছরের মধ্যেই কেষ্ট ঘোষ, নিমাই ঘোষ, বিপদ ঘোষ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। কোনওদিন নদীর ধার বাঁধানোর জন্য কাজ হয়নি। কুনুরে জল বাড়লেই তা পাড়ের মাটি ভাঙতে থাকে।'

    শুধু ঘরবাড়ি নয়, ভাঙনের জেরে ভেঙে পড়ছে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও। গ্রামের রাস্তা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে শেখ আবদুল আলিম বলছেন, 'মাঝিপাড়া যাওয়ার রাস্তা ক্রমশ নদী গিলে খাচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে গ্রাম থেকে কেউ বের হতে পারবে না। কিন্তু কেউ কোনও গুরুত্ব দিচ্ছে না। জল বাড়লে আমাদেরও বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়।' কুনুরের গ্রাসে সারঙ্গপুর বা সরুলিয়ার মতো গ্রামগুলি যখন মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার জোগাড়, তখন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের কথা ভাবছেন স্থানীয় নেতৃত্ব। মঙ্গলকোটের বিধায়ক শিশির ঘোষ বলেন, 'কুনুর নদী সংস্কারের জন্য বিধানসভায় জানিয়েছি। রাজ্য সরকারকেও জানিয়েছি। কাজ হবে।'

  • Link to this news (এই সময়)