• অমলিন 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি', রূপনারায়ণের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গাড়ি থেকে নেমে শরৎ সেতুতে দাঁড়াতেন মহানায়ক
    এই সময় | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না

    মহানায়ক তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। গ্রামে গ্রামে রটে গেল সেই বার্তা ক্রমে- উত্তমকুমার এসেছেন শুটিং করতে! এলাকার আট থেকে আশি সকলেই কাজ ফেলে ছুটলেন শুটিং স্পটে। একটি বারের জন্যও তাঁকে দেখতে পেলেই যেন জীবন সার্থক হয়ে যাবে। রক্ষণশীল পরিবারের মহিলারাও সব নিষেধ অমান্য করে ছুটেছিলেন ওড়ফুলির চরে। কোলাঘাটে রূপনারায়ণের উল্টো দিকে সেই চরে হয়েছিল 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি'-র শুটিং। অধুনা সেই শুটিং স্পট অবশ্য রূপনারায়ণের গর্ভে। তবে, এলাকাবাসীর মনে আজও অমলিন সেই উত্তম-স্মৃতি।

    দূর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তিরতিরে নদী। একটি গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন 'অ্যন্টনি ফিরিঙ্গি' (উত্তমকুমার)। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, নিরুপমাকে (তনুজা)। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তিনি লিপ দিচ্ছেন, 'আমি যে জলসাঘরে...।' আর একটি দৃশ্যে নদীর ধারে হাতে ফুলের গোছা নিয়ে নিরুপমা গাইছিলেন, 'তুঁহু মম মনপ্রাণ হে...।'

    ১৯৬৭-তে মুক্তি পায় সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত, হেন্সম্যান অ্যান্টনির জীবন-কাহিনি নিয়ে নির্মিত 'অ্যন্টনি ফিরিঙ্গি'। সেই সিনেমার বেশ কিছু দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল হাওড়া জেলার অন্তর্গত ওড়ফুলির চরে। ওই ছবির শুটিংয়ের জন্য নাউপালায় পূর্ত দপ্তরের বাংলোয় তিন দিন ছিলেন মহানায়ক। বাংলো থেকে কিছুটা দূরে তেঁতুলমুড়ি নামে একটি জায়গা ছিল। রাস্তার মোড়ে বিশাল তেঁতুল গাছের জন্য জায়গাটি তেঁতুলমুড়ি নামে পরিচিত ছিল। ওই গাছের নীচে হয়েছিল ছবির শুটিং। উত্তমকুমার তখন সেলিব্রিটি। 'গুরু' বলতে মানুষ অজ্ঞান। শুটিং দেখার জন্য ভিড় জমে যেত ওড়ফুলির চরে। কোলাঘাট থেকে কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে যেতেন শুটিং স্পটে। সে সময়ে সুপারহিট বাংলা ছবির তকমা পেয়েছিল 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি'। সিনেমা মুক্তির পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৮-তে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন উত্তমকুমার। 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি' মুক্তি পাওয়ার পরেও তেঁতুলমুড়িতে ছুটে যেতেন পর্যটক ও স্থানীয়রা। স্মরণ করতেন মহানায়কের উপস্থিতি। রূপনারায়ণের গ্রাসে তেঁতুলমুড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তামাম কোলাঘাটবাসীর কাছে মহানায়কের স্মৃতি আজও অমলিন।

    ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন কোলাঘাটের অসীম দাস। স্মৃতি হাতড়ে অসীম বলছেন, 'মহানায়ককে দেখেছিলাম কালো পোশাকে। তাঁর শরীর থেকে যেন আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল। আজ তিনি নেই। সেই তেঁতুলগাছটিও নেই। তবে সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।' পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাইয়ের জাড়া রাজবংশের রায়বাড়ির দুর্গাদালান ও তার সামনের নাটমন্দিরের কিছু দৃশ্যও 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি'তে ব্যবহার করা হয়েছিল। সিনেমার শুটিংয়ের জন্য মহানায়ক উত্তমকুমার অবিভক্ত মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। ১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক বা মুম্বই রোড ধরে যাতায়াত করতেন তিনি। কোলাঘাটের প্রবীণ নাগরিকরা বলছেন, 'অনেক সময়ে মহানায়ক রূপনারায়ণের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গাড়ি থেকে নেমে কোলাঘাটের শরৎ সেতুর উপরে চলে যেতেন। অনেকেই তাঁকে দূর থেকে সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। তবে ভিড় জমে যাওয়ার আগেই তিনি গাড়িতে উঠে পড়তেন।'

    শরৎ সেতুর নীচে সমরেশ পাঁজার একটি হোটেল রয়েছে। সমরেশ একাধিক বার মহানায়ককে শরৎ সেতুর উপরে ঘুরতে দেখেছেন। তিনি বলছেন, 'উত্তমকুমার এই পথ দিয়েই মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গায় শুটিংয়ের জন্য যেতেন। মাঝেমধ্যে তিনি গাড়ি থেকে সেতুর উপরে নেমে পড়তেন। আপন মনে তাকিয়ে থাকতেন নদের জলের দিকে। আমিও বেশ কয়েক বার ওঁকে ও ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।'

    কোলাঘাটের বাসিন্দা বছর ৭৪-এর গৌরদাস ঠাকুর বলছেন, 'অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ছবির শুটিংয়ের সময়ে বেশ কয়েক বার মহানায়ককে দেখেছি। তিন দিন কোলাঘাটের আশেপাশের সমস্ত গ্রাম কার্যত জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। সকলের একটাই চাওয়া- একটি বারের জন্য হলেও মহানায়ককে চোখের দেখা দেখবেন। আজও রূপনারায়ণের ওপারে তাকালে স্মৃতিতে ভাসে সেই সব দিন।'

  • Link to this news (এই সময়)