• অর্থাভাবে জোটেনি রং-তুলি! শান্তিপুরের বিকাশের পেন-ড্রয়িংই ঠাঁই পাবে থাইল্যান্ডের প্রদর্শনীতে
    প্রতিদিন | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে দামি, রং তুলি কিনতে পারেননি কোনও দিন। কিন্তু তাতে থেমে থাকেননি শান্তিপুরের তরুণ শিল্পী বিকাশ দে। মাত্র ৫-১০ টাকার সাধারণ রঙিন বলপেনই শিল্পের মাধ্যম। আর সেই পেনের সাহায্যেই মানুষের জীবনদর্শনের নানা দিক তুলে ধরেন বিকাশ। ‘ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ’ (নিজের মধ্যে বিচরণ) শীর্ষক তাঁর ব্যতিক্রমী একটি পেন-ড্রয়িং এবার থাইল্যান্ডের একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।

    ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল বিকাশের। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ঘরের মেঝে কিংবা খাতার পাতায় পেন-পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতেন তিনি। সেই আগ্রহ সময়ের সঙ্গে নিয়মিত শিল্পচর্চায় পরিণত হয়। প্রচলিত রং-তুলি বা ব্যয়বহুল শিল্পসামগ্রীর পরিবর্তে হাতের কাছে থাকা সাধারণ বলপেনকেই নিজের সৃষ্টির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন বিকাশ।

    মাত্র ৫-১০ টাকার রঙিন বলপেন দিয়ে সূক্ষ্ম রেখা, রঙের ব্যবহার এবং বিভিন্ন শেডের মাধ্যমে তিনি তৈরি করেন পেন-ড্রয়িং। তাঁর শিল্পকর্মে মানুষের জীবন, অনুভূতি এবং অন্তর্জগতের বিভিন্ন ভাবনা ফুটে ওঠে। ‘ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ’ ছবিটিতেও মানুষের জীবনদর্শনের নানা রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।

    বিকাশের শিল্পচর্চার পথচলা অবশ্য সহজ ছিল না। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া কিংবা দামি রং, তুলি ও অন্যান্য শিল্পসামগ্রী কেনার সুযোগ হয়নি। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা তাঁর শিল্পচর্চাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। সাধারণ পেন-পেন্সিল দিয়েই নিজের মতো করে অনুশীলন চালিয়ে গিয়েছেন তিনি।

    বিকাশের মা অপর্ণা দে একসময় বিড়ি বেঁধে সংসার চালাতে সাহায্য করেছেন। বর্তমানে তিনি সেলাইয়ের কাজ করেন। তাঁর বাবা একসময় লাইব্রেরির সামনে চায়ের দোকান চালাতেন। পরে সেই দোকান উচ্ছেদ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ফুটপাতের উপর ঠেক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শিল্পচর্চার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও এগিয়েছেন বিকাশ। সংস্কৃতে স্নাতক পাশ করার পর আইটিআই থেকে ফিটার ট্রেডের প্রশিক্ষণও সম্পূর্ণ করেছেন। তবে পড়াশোনা ও পেশাগত শিক্ষার পাশাপাশি ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনও কমেনি। শিল্পচর্চাই হয়ে উঠেছে তাঁর অন্যতম প্রধান সাধনা।

    এই দীর্ঘ সাধনারই স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক স্তরে। ‘সুরভারতী সঙ্গীত কলা কেন্দ্র’-এর মাধ্যমে বিকাশের আঁকা ‘ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ’ থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। সাধারণ রঙিন বলপেন দিয়ে তৈরি এই শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি বিকাশ ও তাঁর পরিবার। একদিকে সাধারণ বলপেন, অন্যদিকে শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা ও দক্ষতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে ‘ওয়ান্ডারিং ইন ইওরসেলফ’। দামি উপকরণের পরিবর্তে সীমিত মাধ্যম ব্যবহার করেও যে শিল্পে গভীর ভাবনা ও নান্দনিকতা প্রকাশ করা সম্ভব, বিকাশের এই কাজ তারই উদাহরণ।
  • Link to this news (প্রতিদিন)