• বরফ গলে ফুলে উঠছে হ্রদ, নেপালের পর কাশ্মীরেও গ্লফের আশঙ্কা!
    এই সময় | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    পাহাড়টা যে আর আগের মতো নেই, তা বেশ বুঝতে পারছেন স্থানীয়রা। বরফ পিছোচ্ছে, হিমবাহের মুখ সরে যাচ্ছে, সামনে জমছে জল। কোথাও নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে, কোথাও পুরোনো হ্রদের আয়তন বাড়ছে। উঁচু ঢালে জমে থাকা বরফের স্তূপ ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কাশ্মীরের ওয়ারওয়ান উপত্যকায় এই পরিবর্তনগুলি একই বিপদের সূত্রে বাঁধা। নেপালের বিপর্যয়ের পরে ভূতত্ত্ববিদদের একাংশের আশঙ্কা, তুষার ধস বা ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ যে কোনও সময়ে লেক–বি-র পাড় ভেঙে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা ‘গ্লফ’ ঘটাতে পারে। পহেলগাম, গুলমার্গ, সোনমার্গের মতো ওয়ারওয়ান জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়। হয়তো সেই কারণেই এই জায়গা এখনও তেমন ভাবে আলোচনায় আসেনি। কিন্তু, তাই বলে কি ভবিতব্য এড়ানো সম্ভব!

    নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিপর্যয় নয়, এই ঘটনা গোটা পশ্চিম হিমালয়ের শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছে। কিশতওয়ার পশ্চিম হিমালয়ের যে জায়গার অংশ, সেখানকার ওয়ারওয়ান উপত্যকায় ২৭২টি হিমবাহ রয়েছে। ১৯৯০-তে এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ ছিল সাতটি, এখন ১২টি। অর্থাৎ শুধু বরফ গলছে না, বদলে যাচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের জলবিন্যাস বা হাইড্রোলজির মানচিত্রও।

    আইআইটি ভুবনেশ্বরের আসিম সাত্তার, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব জম্মুর শশীকান্ত রাই ও সুনীল ধার, চার্লস ইউনিভার্সিটির (চেক রিপাবলিক) অভিনব আলঙ্গাদন, গ্রাজ ইউনিভার্সিটির (অস্ট্রিয়া) অ্যাডাম এমার, ইউনিভার্সিটি অব ডেটনের (ওহায়ো, ইউএসএ) উমেশ হরিতাশ্য এবং আইআইটি ইন্দোরের মহম্মদ ফারুক আজম ‘আনরিপোর্টেড মাস মুভমেন্টস অ্যান্ড ফিউচার হ্যাজ়ার্ড ইন দ্য ওয়ারওয়ান বেসিন, জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর, ওয়েস্টার্ন হিমালয়’ গবেষণায় এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

    এখানকার লেক–বি নিয়ে উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট। ১৯৯৯-তে হ্রদটির আয়তন ছিল ০.০৭৫ বর্গকিলোমিটার, ২০২৪-এ বেড়ে হয়েছে ০.৩০৬ বর্গকিলোমিটার— বৃদ্ধি প্রায় ৩০৮ শতাংশ। হিমবাহ পিছিয়ে সামনে তৈরি হওয়া অববাহিকায় জমছে গলিত বরফের জল। হ্রদের আয়তনও বাড়ছে। মডেল অনুযায়ী, হ্রদটি সর্বাধিক প্রায় ৭৭ লক্ষ ঘনমিটার জল ধারণ করতে পারে। গভীরতা কোথাও প্রায় ৬০ মিটার। বন্যা হলে প্লাবন-এলাকায় পড়তে পারে ৯টি সেতু, ৪০টি বাড়ি এবং একাধিক রাস্তা। পরিকাঠামোর কাছে জলের গভীরতা ২ থেকে ৪ মিটার এবং স্রোতের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৪–২২ কিলোমিটার বা ৪–৬ মিটার/সেকেন্ড হতে পারে।

    নেপালের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গে ২৬ অগস্ট বিশাল বরফের চাঁই খসে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল। একই ধরনের ঘটনা ২০০৫-এ ওয়ারওয়ানের গ্লেসিয়ার–বি-তে ঘটেছিল। প্রায় ৫,১৫০ মিটার উচ্চতা থেকে আইস অ্যাভালাঞ্চ নেমেছিল, যদিও সেবার বরফ হ্রদ পর্যন্ত পৌঁছয়নি। কিন্তু ২০২৪-এর হ্রদ ২০০৫-এর তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বড়। তাই একই ধস ফের নামলে তা সরাসরি হ্রদে আঘাত করতে পারে।

    বিপদ শুধু জলে নয়। ওয়ারওয়ানের ঢাল ও নদীখাতে বিপুল আলগা পলি, শিলা ও নুড়ি জমে রয়েছে। হ্রদের জল বেরিয়ে সেই পলি টেনে নিয়ে বন্যাকে দ্রুত ‘ডেব্রি ফ্লো’ বা কাদামাটি-শিলা-বোঝাই স্রোতে বদলে দিতে পারে। ঠিক যেমনটা হয়েছে নেপালের রাসুয়ায়। প্রথমে ধস, পরে হ্রদের পাড় ভাঙা, শেষে পলি-প্রবাহ—এ ভাবেই তৈরি হতে পারে বিপদের ‘ক্যাসকেড’।

    নজির রয়েছে পাশের লেক–এ-তে। ২০২০-তে গ্লেসিয়ার-এ থেকে প্রায় ২.৩৬ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে একটি ধস হ্রদে আঘাত করে জল ও পলি বাইরে বার করে দিয়েছিল। তবে সে বার বিপর্যয় হয়নি।

    জিওমর্ফোলজিস্ট সুজীব কর বলেন, ‘গড় উষ্ণতা বাড়ায় উচ্চ ঢালের পারমাফ্রস্ট বা বরফে জমাট মাটি গলছে, ফলে পাথর ও বরফের বুনোট দুর্বল হচ্ছে। এক দিকে হিমবাহ পিছোচ্ছে, অন্য দিকে ঢাল অস্থিতিশীল হচ্ছে, নীচে জমছে পলি, মাঝখানে ফুলে উঠছে হিমবাহ-হ্রদ। অর্থাৎ পাহাড়ের বরফ-পাথর-জল—তিন ব্যবস্থাই একসঙ্গে বদলাচ্ছে।’

    ফলে বিপদ বাড়ছে ওয়ারওয়ানের নীচের জনবসতিগুলির। ইউরোড, কাদেরনা, আনিয়ার, রিনাই ও মেটওয়ান প্রায় ৫০-৫৫ কিলোমিটার দূরে। বড় গ্লফ হলে মডেল অনুযায়ী প্রায় ছ’ঘণ্টায় নীচের এলাকায় জল পৌঁছতে পারে। পথে রয়েছে সেতু, রাস্তা, বাড়িঘর। আরও প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে ৮০০ মেগাওয়াটের বুরসার এবং ১,০০০ মেগাওয়াটের পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

    গবেষকদের বক্তব্য, এটি আশু কোনও বিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণী নয়। কিন্তু পাহাড়ের বদলে যাওয়া চেহারা বলছে, ঝুঁকি আর আলাদা করে হিমবাহ, হ্রদ, ধস বা বন্যায় বিচ্ছিন্ন নেই। ওয়ারওয়ানে বিপদটি এখন সমন্বিত ভূপ্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং প্রস্তুতিই বাঁচার একমাত্র ভরসা।

  • Link to this news (এই সময়)