সঞ্জয় দে, দুর্গাপুর
বালির গ্রেডেশন ব্যবসার রূপরেখা বা গাইডলাইন কখনও তৈরি হয়নি এই রাজ্যে। তার জেরে পশ্চিম বর্ধমান জেলায় মুখ থুবড়ে পড়ল প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প। রাজ্যের নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত দুর্গাপুরে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট তৈরির ঘোষণা করেছিলেন। এই ইউনিট গড়ার আগে বালির গ্রেডেশন ব্যবসার গাইডলাইন তৈরি করার পাশাপাশি মান্যতা দিক সরকার।
বালির সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টরের সম্পর্ক কী? বালির মধ্যে থাকা সিলিকন ডাইঅক্সাইডকে জটিল রাসায়নিক ও ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতি বিশুদ্ধ সিলিকনে পরিণত করে এই চিপ তৈরি করা হয়। একই ভাবে রং তৈরির কারখানায় সিলিকা বালির প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বাজারে যে সব দানাযুক্ত বা খসখসে রং পাওয়া যায় সেগুলির মূল উপাদান হলো বালি বা কোয়ার্টজ় কণা। এ ছাড়া রাইস মিল, টাইলস, ওয়াল পুট্টি, ড্যামপ্রুফ, কাচ শিল্প, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, সোলার প্যানেল ফ্যাক্টরিতে এই বালি প্রয়োজন হয়।
সাধারণত যে বালি আমরা দেখতে অভ্যস্ত সেই বালি কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর বা শিল্পের কাজে ব্যবহার হয় না। নদী থেকে তুলে নিয়ে আসা বালি শুকিয়ে ঝরঝরে করার পরে বিভিন্ন মাপের চালুনি ও ভাইব্রেটরের সাহায্য সেই বালির গ্রেডেশন করা হয়।
বিশ্বে গ্রেডেশন বালির ব্যবসার টার্নওভার বছরে ২৬ বিলিয়ন ডলার। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট রূপরেখার জন্য পশ্চিম বর্ধমান জেলায় ২০০ কোটি টাকার বালির গ্রেডেশনের ব্যবসা প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ। কাজ হারিয়েছেন ১০ হাজারের বেশি শ্রমিক। যাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশই মহিলা।
২০০৮-এ পশ্চিম বর্ধমান জেলার পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভার লাউদোহা ব্লকের গৌরবাজারে এই ব্যবসা শুরু করেন পীযূষ দত্ত। বর্তমানে যা চালাচ্ছেন তাঁর ভাই সজলকান্তি দত্ত। তাঁর কথায়, 'বালির গ্রেডেশনের জন্য নিজস্ব মেশিন ও পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরি রয়েছে আমাদের। বছরে ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হতো। এখন সব বন্ধ। ভেন্ডাররা বালি চাইছেন, দিতে পারছি না।'
ব্যবসা বন্ধ হলো কেন? সজলকান্তির বক্তব্য, 'আমি বালি কারবারিদের কাছ থেকে বৈধ ভাবে বালি কিনে মজুত করছি। ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি আছে। তা সত্ত্বেও পুলিশ গাড়ি আটকে টাকা দাবি করছে। বলছে বালির আবার গ্রেডেশন কী? এই সব অসুবিধের জন্য ব্যবসা বন্ধ করেছি।'
কলকাতার একটি কনসালটেন্সি সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছেন সজলকান্তি। ওই কনসালটেন্সি সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিন্দোল গোস্বামী বলেন, 'আমরা পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। বিস্তারিত তথ্য দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং এমএসএমই বিভাগের মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি।' পুলিশ কমিশনার প্রণব কুমার বলেন, 'এটা নতুন ধরনের একটা শিল্প। তবে এটা তো বালি, কোথা থেকে তা কিনছেন, সেটা বৈধ ভাবে না অবৈধ ভাবে কেনা হচ্ছে— এই সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে বলা হয়েছে।'