অযোধ্যার ‘রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টে’র প্রথম সিইও বা মুখ্য কার্যনির্বাহী হলেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জিতেন্দ্র মিশ্র। ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। এমনকী ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ কম্যান্ডারের গুরুদায়িত্ব সামলেছেন তিনি। দেশমাতৃকাকে রক্ষার দায়িত্বভার সফল ভাবে সামলেছেন যিনি, তাঁর হাতেই রামমন্দিরের দায়িত্ব তুলে দিল ট্রাস্টি বোর্ড। ট্রাস্টের শীর্ষ স্তরের বৈঠকেই অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জিতেন্দ্র মিশ্রের নাম চূড়ান্ত হয় বলে খবর। ৫ হাজার আবেদনপত্র ঝাড়াই বাছাইয়ের পরে তাঁর নামেই পড়ল সিলমোহর।
অযোধ্যায় রামমন্দিরের কোটি কোটি টাকা প্রণামী চুরি বিতর্কের পরেই মন্দির পরিচালনা সংক্রান্ত দৈনন্দিন কাজ দেখভালের জন্য একজন পূর্ণ সময়ের সিইও নিয়োগের চিন্তাভাবনা শুরু করে ‘রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’। গঠন করা হয় সার্চ কমিটি। এই সার্চ কমিটির তিন সদস্য—অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি প্রমোদ কোহলি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিষ্ণুকান্ত চতুর্বেদী এবং শিল্পপতি সুরেশ হাওয়ারে দফায় দফায় বৈঠকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ৫,৫৮৫টি নাম থেকে বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেন।
সূত্রের দাবি, আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন IAS ও IPS আধিকারিক, ব্রিগেডিয়ার ও তার উপরের পদমর্যাদার সামরিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়ার পরে কমিটি ১৬ জন প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেয় এই কমিটি। তার থেকেই হলো চূড়ান্ত বাছাই। প্রায় দুই মাস ধরে একাধিক ধাপে আবেদনকারীদের যাচাই, অনলাইন ও সরাসরি সাক্ষাৎকারের পর তিন সদস্যের একটি প্যানেল চূড়ান্ত বাছাই করে। শেষ পর্যন্ত জিতেন্দ্র মিশ্রর নামেই সিলমোহর পড়ে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানের প্রশাসনিক দায়িত্বে যাঁকে আনা হল, তাঁর পিছনে রয়েছে প্রায় চার দশকের সামরিক অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতার তালিকায় রয়েছে কার্গিল যুদ্ধের ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান।
জিতেন্দ্র মিশ্র ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে ফাইটার পাইলট হিসেবে ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দেন। কার্গিল যুদ্ধের সময়ে তিনি ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার। সেই সময়ে মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমানে লেজার-গাইডেড বোমা কার্যকর করতে সাহায্য করে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
কার্গিল যুদ্ধের ‘অপারেশন সফেদ সাগর’-এ ভারতীয় বায়ুসেনার মিরাজ-২০০০ এয়ারক্র্যাফ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। মিশ্র যে দলটির সঙ্গে কাজ করেছিলেন, তাদের প্রচেষ্টায় এই অত্যাধুনিক অস্ত্র নির্ভুল ভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হন তাঁরা। পরে টাইগার হিল এবং মুনথো ধালো-র মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাক অনুপ্রবেশকারীদের কুপোকাৎ করতে ও হামলার সময়ে সেই Laser-Guided Bomb ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ, রাম মন্দিরের নতুন CEO শুধু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রাক্তন সামরিক কর্তা নন, ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ-অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি।
জিতেন্দ্র মিশ্র দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ভারতীয় বায়ুসেনায় কর্মরত ছিলেন। ৩,০০০ ঘণ্টারও বেশি ফ্লাই করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ফাইটার কমব্যাট লিডার ও এক্সপেরিমেন্টাল টেস্ট পাইলট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফাইটার স্কোয়াড্রন ও বিমানঘাঁটির কমান্ডার ছিলেন তিনি। এয়ারক্র্যাফ্ট এবং সিস্টেম এস্টাবলিশমেন্ট (Aircraft and Systems Testing Establishment)-এর চিফ টেস্ট পাইলট (Chief Test Pilot) হিসেবেও কাজ করেছেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি ইন্টিগ্রেটেড ডিফেন্স স্টাফ-এর ডেপুটি চিফ (Deputy Chief)-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি ভারতীয় বায়ু সেনার ওয়েস্টার্ন এয়ার কম্যান্ডের-এর এয়ার অফিসার কম্যান্ডিং-ইন-চিফ (Commanding-in-Chief) হন। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষে বায়ুসেনা থেকে অবসর নেন তিনি।
২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় Western Air Command-এর নেতৃত্বে ছিলেন জিতেন্দ্র মিশ্র। এই অভিযানে তাঁর নেতৃত্ব এবং সামরিক অবদানের জন্য পরবর্তী সময়ে তাঁকে সর্বোত্তম যুদ্ধ সেবা মেডেল-এ সম্মানিত করা হয়। তা সেনার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ মর্যাদার সামরিক সম্মানগুলির একটি।
ফলে কার্গিলের ‘অপারেশন সফেদ সাগর’ থেকে ‘অপারেশন সিঁদুর’—দুই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের দায়িত্বে দেখা যাবে তাঁকে।
রাম মন্দিরের নির্মাণের পাশাপাশি এখন মন্দির ও বিশাল তীর্থক্ষেত্রের দৈনন্দিন প্রশাসন, নিরাপত্তা, ভক্তদের পরিষেবা, বিভিন্ন প্রকল্পের সমন্বয় এবং অর্থ ব্যবস্থা আরও পেশাদার ভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের সামরিক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতাকে কাজে লাগাতেই মিশ্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাস্টের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাদার করার লক্ষ্যেও এই নিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে মন্দিরের অনুদান ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের পরে ট্রাস্টের প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। সেই আবহে একজন প্রাক্তন শীর্ষ সামরিক আধিকারিককে CEO করা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।