কষ্ট পাচ্ছে রামলাল। পায়ের ব্যথায় ঠিক করে হাঁটতে পারছে না সে। হাঁটতে হাঁটতে বার বার থেমে যাচ্ছে। কখনও যন্ত্রণায় পা তুলে নিচ্ছে, কখনও আবার শুয়ে থাকছে দীর্ঘক্ষণ। কখনও দেখা যাচ্ছে পুকুরে শরীর ডুবিয়ে চুপটি করে বসে আছে। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় হাতি রামলালের এমন অসহায় অবস্থা দেখে মন খারাপ এলাকার বাসিন্দাদের।
মঙ্গলবার মেদিনীপুর সদর ব্লকের চাঁদড়া এলাকা (news in bengali) থেকে এসে রঞ্জা বিটের ৫৫৫ নম্বর গেটের কাছে আশ্রয় নেয় রামলাল। এর পরেই স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে, স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারছে না হাতিটি। পিছনের বাঁ পায়ে চোট রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। দূর থেকে দেখা গিয়েছে, হাঁটার সময়ে বার বার সেই পা তুলে নিচ্ছে রামলাল। পায়ের তলায় কিছু ঢুকে থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে কী ভাবে এবং কোথায় চোট লেগেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
পায়ের যন্ত্রণার কারণে আগের মতো দূরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতেও পারছে না রামলাল। তাই স্থানীয় বাসিন্দারাই দূর থেকে আলু, কলা-সহ বিভিন্ন সবজি ছুড়ে দিচ্ছেন। কিছু খাবার খাচ্ছে, আবার কিছু ছড়িয়ে ফেলছে। বেশির ভাগ সময়েই তাকে শুয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। প্রিয় হাতিটিকে এক ঝলক দেখতে ইতিমধ্যেই ভিড় জমাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রামলালের অসুস্থতার খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন বনদপ্তরও। মেদিনীপুরের ডিএফও জাস্টিন জে বলেন, ‘রামলালের পায়ে একটা চোট রয়েছে। জানতে পেরেই আমরা মনিটরিং শুরু করি। একটি ভেটেরিনারি টিম রামলালের উপরে নজরদারি চালাচ্ছে। চোটের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়েছে। কিছুটা ওষুধ খেয়েছে। চিকিৎসা চলার পাশাপাশি নজরদারি চলছে। হাতিটি যন্ত্রণা পাচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞ দল কলার মাধ্যমে রামলালকে ওষুধ খাইয়েছে।
জঙ্গলমহলের মানুষের কাছে রামলাল শুধু একটি হাতি নয়, যেন বহু চেনা, আপনজন। বয়স মোটামুটি ৫৫-এর কাছাকাছি হবে। ধীর-স্থির চলাফেরা, শান্ত স্বভাব এবং সাধারণত কারও দিকে তেড়ে না যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বাসিন্দাদের কাছে তার আলাদা আদর রয়েছে।
বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, নয়ের দশক থেকে রামলালকে দেখা গিয়েছে ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলে। একবার নিমপুরায় মালগাড়ির ধাক্কায় জখম হয়েছিল একটি দাঁতাল। চোট পেয়েছিল বাঁ পায়ে। অনেকের অনুমান, সেই চোট পাওয়া দাঁতালই এই রামলাল। পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহলে অবাধ বিচরণ তার। কোনও গ্রামে রামলাল ঢুকলে তাকে ঘিরে তৈরি হয় কৌতূহল। অনেক সময়ে বাড়ি থেকে বাসিন্দারা আলু, কলা, কুমড়ো-সহ বিভিন্ন খাবার ছুড়ে দেন। রামলালও নিজের মতো করে সেগুলি খেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায়।
সেই শান্ত স্বভাবের প্রিয় রামলালই এখন পায়ের চোটে কাতর। হাঁটতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছে, কষ্টে পা তুলছে— এই দৃশ্যই ভাবিয়ে তুলেছে জঙ্গলমহলের মানুষকে। বনদপ্তরের নজরদারি ও চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে ফের আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াক রামলাল— এটাই এখন বাসিন্দাদের প্রার্থনা।