এই সময়: কাদা আর পাথরের স্তূপ সরিয়ে মৃতদেহ উঠে আসছে নেপালে। এখনও সামলানো যায়নি বিপর্যয়ের অভিঘাত। তার মধ্যেই বিপদের সিঁদুরে মেঘ উত্তরাখণ্ড এবং হিমাচল প্রদেশে। নাগাড়ে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিতে মঙ্গলবার থেকে বুধবার সন্ধে পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাখণ্ডে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৪ জনের। এই একই সময়ে হিমাচল প্রদেশে তিন জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। এই নিয়ে ৩০ জুন থেকে বুধবার পর্যন্ত এই রাজ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা হলো ২৫৯। প্রবল বৃষ্টির ফলে ধস নেমে মৃত্যুর খবর এসেছে অসম থেকেও। বুধবার গুয়াহাটিতে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে একই পরিবারের তিন জন। উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, উত্তরপ্রদেশে একাধিক নদী বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। উত্তরপ্রদেশের একাধিক জায়গায় তৈরি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। ঝাড়খণ্ডের ১০টি জেলায় জারি হয়েছে হড়পা বানের সতর্কতা।
মঙ্গলবারই প্রবল বৃষ্টির লাল সতর্কতা জারি করেছিল আবহাওয়া দপ্তর। যাবতীয় আশঙ্কা সত্যি করে বুধবার রাত পর্যন্ত প্রবল বৃষ্টি চলার খবর এসেছে উত্তরাখণ্ডের একাধিক জায়গা থেকে। সবথেকে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে হরিদ্বার জেলায়। এখানে অন্তত ছ’জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া টিহরি জেলায় তিন, দেরাদুনে দুই এবং চামোলিতে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দেরাদুনে প্রবল জলস্রোতে গাড়ি সমেত ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয় দু’জনের। সেই গাড়িতেই থাকা আর এক মহিলাকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে আলমোড়া জেলার ‘ধর কি টুনি’ পাণ্ডেখোলায় মঙ্গলবার রাত তিনটে নাগাদ একটি কাঁচা বাড়ির উপরে ধস নেমে আসে। তাতে দিলীপ দর্জি (৩৩) এবং চক্র দর্জি (৩২) নামে দুই নেপালি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নেপালের কালীকোট জেলার এই দুই বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে আলমোড়ায় কাজ করতে এসেছিলেন।
বিপর্যয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছে উত্তরাখণ্ডের অন্তত ১৭২টি রাস্তা। এর মধ্যে দেরাদুন-মুসৌরি হাইওয়ে, গঙ্গোত্রী ন্যাশনাল হাইওয়ে, যমুনোত্রী জাতীয় সড়কের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা রয়েছে। শুধুমাত্র কুমায়ুন জেলাতেই ১৪১টি রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে রাজ্য প্রশাসন সূত্রের খবর। এর ফলে রানিক্ষেত ও আলমোড়া রাজ্যের বাকি অংশের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হলদওয়ানি থেকে নৈনিতাল-ভীমতাল যাওয়ার রাস্তাও ধসে বন্ধ। তাওয়াঘাট-লিপুলেখ এবং মুনশিয়ারি-মিলাম রাস্তা বন্ধ হওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ২০টির বেশি পাহাড়ি গ্রাম।
এখানেই শেষ নয়। লাগাতার বৃষ্টিতে ২৭ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে গোলা নদীতে। ফলে হলদওয়ানি, উধম সিং নগরে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা গিয়েছে। ঋষিকেশে বিপদসীমা ছাড়িয়ে বইছে বিন নদী। নৈনিতাল ও আলমোড়ার আশপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যাওয়া কোসি, সুয়াল, সিপরার মতো নদীতে জল বেড়েছে। এই দুই এলাকায় বৃষ্টির লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বুধবার বিকেল পর্যন্ত শেষ ২৪ ঘণ্টায় শুধু নৈনিতালেই বৃষ্টি হয়েছে ২১৭ মিলিমিটার। সমস্ত স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নৈনিতাল, বাগেশ্বর ও আলমোড়া প্রশাসন।
বাগেশ্বরের জেলাশাসক অপূর্বা পাণ্ডে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই একাধিক জায়গায় ভূমিধসের খবর আসছে। বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা নদী, ঝোরার পাশ থেকে স্থানীয়দের সরে যেতে বলা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলি থেকে বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে রাজ্য।
চাম্বায় হড়পা বানে আটকে পড়া বাইকচালককে ওড়নার সাহায্যে তরুণীর বাঁচানোর ঘটনা নিয়ে দেশে সাড়া পড়েছে। তবে তা ছিল নেহাতই ভাগ্যের জোর। বৃষ্টি, হড়পা বান আর ধসে গত ৩০ জুন থেকে বুধবার পর্যন্ত হিমাচল প্রদেশে অন্তত ২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রের খবর। জানা গিয়েছে, বুধবার সিরমৌর জেলায় ধস নেমে তিন শ্রমিক মারা যান। তাঁদের মধ্যেও দু’জন নেপালের বাসিন্দা বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। যদিও এ ব্যাপারে বুধবার রাত পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায়নি।
স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টারের (এসইওসি) রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ৬৪ দিনে বৃষ্টিজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে ১০৬ জনের। তার মধ্যে ধস নেমে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন, জলে ভেসে মারা যান আরও ১৩ জন। গাছ ও পাথরের নীচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। লাহুল, স্পিতির মতো অধিক–উচ্চতার এলাকাগুলি থেকে ১৫টি মৃত্যুর খবর এসেছে। অন্য দিকে, বর্ষায় সড়ক দুর্ঘটনা কেড়েছে ১৫৩ জনের জনের। ৪৬৮ জন জখম এবং তিন জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে রিপোর্টে দাবি। এই ক’দিনে হিমাচলে মারা গিয়েছে ৪৫০-রও বেশি পশু। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হিমাচলে অন্তত ১৫০টি রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যার মধ্যে মান্ডির ৭৮ এবং শিমলার ৩০টি রাস্তা রয়েছে। প্রশাসনের হিসেবে গত দু’মাসে রাজ্যে ১,২০০ কোটি টাকার সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উত্তরাখণ্ডের নদীগুলিতে জল বেড়ে যাওয়ায় এবং লাগাতার বৃষ্টিতে উত্তরপ্রদেশের একাধিক জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিস্থিতি লখিমপুর খেরি, চিত্রকূট, বারাণসীর মতো এলাকা। চিত্রকূটে বিপদসীমার চার ফুট উপর দিয়ে বইছে মন্দাকিনী নদী। দুর্গতদের উদ্ধারকাজে নামানো হয়েছে আর্মি হেলিকপ্টার। গঙ্গার জলস্তর বেড়ে ভাসছে বারাণসীর একাধিক এলাকা। ব্যাঘাত ঘটছে মণিকর্নিকা ও হরিশচন্দ্র ঘাটে শেষকৃত্যের কাজ। প্রয়াগরাজেও গঙ্গা ও যমুনার জল বিপদসীমা ছাড়িয়েছে।
একাধিক নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় ঝাড়খণ্ডের ১০ জেলায় হড়পা বানের হাই অ্যালার্ট জারি করেছে মৌসম ভবন। গরওয়া, পালামৌ, সিমডেগা, পূর্ব এবং পশ্চিম সিংভূম, লাতেহার, লোহারদাগা, গুমলা, খুন্টি ও সরাইকেলা-খারসাওয়ানে এই সতর্কতা জারি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে খবর, সোমবার থেকে পূর্ব সিংভূমের দুমারিয়ায় ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যেখানে গিরিডির দুমরিতে ১৬২ মিমি এবং লাতেহারে ১৪২ মিমি বৃষ্টি হয়েছে। এই তীব্র বৃষ্টির ফলে উঁচুনিচু এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া খড়কাই, সুবর্ণরেখা, দামোদর, ভৈরবী বা কুইলির মতো নদীতে হড়পা বান নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।