প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
‘তেঁতুল বটের কোলে/ দক্ষিণে যাও চলে/ ঈশান কোণে ঈশানী/ কহে দিলাম নিশানী’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গুপ্তধন’ গল্পে সন্ন্যাসী তুলট কাগজে নানা সাঙ্কেতিক চিহ্নর মাধ্যমে হরিহরকে গুপ্তধনের সন্ধান দিয়েছিল। ঠিক তেমনই গুপ্তধনের সন্ধান মিলেছে পুরুলিয়ায়। উত্তর পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখা (শিয়ার জ়োন) ধরে মাটির তলায় সঞ্চিত রয়েছে বিপুল বিরল খনিজ সম্পদ।
জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জিএসআই) ও অ্যাটমিক মিনারেলস ডিরেক্টরেটের (এএমডি) যৌথ ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ঝাড়খণ্ড সীমানা লাগোয়া ঝালদা-২ ব্লকের বেলামু পাহাড় থেকে শুরু করে নওয়াহাতু, কালাপাথর, রঘুডি, রঘুনাথপুর হয়ে বাঁকুড়ার ছাতনা ও পুরুলিয়ার কাশীপুর পর্যন্ত এই বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণ পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখাতেও খনিজের সম্ভাবনা থাকলেও তার রিপোর্ট এখনও প্রকাশ পায়নি। তবে উত্তর পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখা জুড়ে থাকা মিনারেলসকে বিশেষজ্ঞরা পূর্ব ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ভাণ্ডার হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যর প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্র সংসদে জানায়, পুরুলিয়ার একটি ব্লকে ১.৭৮ লক্ষ টন আকরিক চিহ্নিত হয়েছে, যাতে ০.৪% সিজিয়াম, ০.৩% লিথিয়াম ও ০.০১% রুবিডিয়াম রয়েছে। এলাকাটি ইতিমধ্যেই নিলামের জন্য চিহ্নিত হয়েছে। রেলপথ ও রাঁচি বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় এটি অর্থনৈতিক ভাবেও অত্যন্ত লাভজনক। পাশাপাশি পুরুলিয়া-বাঁকুড়ায় ১০টি দুর্লভ খনিজ প্রকল্প গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং জিএসআই জি-২ স্তরের উন্নত অনুসন্ধান শুরু করেছে।
পুরুলিয়ার কালাপাথর-রঘুডি অঞ্চলে ল্যান্থানাইড ও ইট্রিয়াম সমেত ১৬টি ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে, যেখানে প্রায় ৬.৭০ লক্ষ টন রেয়ার আর্থ উপাদান রয়েছে। দু’টি চ্যুতিরেখা জুড়ে অ্যালকালাইন কার্বোনাটাইট পাথর থেকে লিথিয়াম, ফসফরাস এবং মোনাজাইট প্লেসার্সও মেলার সম্ভাবনা দেখেছেন বিশেষজ্ঞরা। ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, মোবাইল, ল্যাপটপের ব্যাটারি তৈরিতে লিথিয়াম এবং পারমাণবিক গবেষণা ও জিপিএস সিস্টেমে সিজিয়াম অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া এই বিরল খনিজগুলি শক্তি সঞ্চয় ও আধুনিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
এ প্রসঙ্গে পুরুলিয়ার সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের অধ্যাপক তথা পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ বেরা বলেন, ‘উত্তর পুরুলিয়ার চ্যুতিরেখা জুড়ে যে বিরল খনিজের সন্ধান মিলেছে এ বার তার নিলাম হবে। তার পরে খনন শুরু হবে। যার ফলে পুরুলিয়া বা বাংলায় নয়া শিল্পের সম্ভাবনা যেমন উজ্জ্বল হবে পাশাপাশি বিদেশের উপরে নির্ভরশীলতাও কমবে। কর্মসংস্থান তৈরি হবে, বাড়বে রাজস্ব।’ তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণের দিকেও তিনি নজর দেওয়ার দাবি জানান
ঝালদার বাসিন্দা তথা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের গবেষক পড়ুয়া প্রশান্ত মণ্ডলের কথায়, ‘পুরুলিয়ায় এই বিরল খনিজ মেলার খবরে আমরা যাঁরা এই বিষয় নিয়েই গবেষণা করছি তাঁদের কাছে আশার আলো। মেধার বিষয়টি সামনে রেখে আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে এই প্রত্যাশা করছি।’