হিমবাহে বিপদ, নেপাল থেকে শিক্ষা নিচ্ছে সিকিম! বিপদ রুখতে কী ব্যবস্থা
প্রতিদিন | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিকিমে (Sikkim) ৪০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করেছে ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’। সেগুলোর মধ্যে সাতটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। হিমবাহ হ্রদের বিপর্যয়ের ফলে হড়পা বানের মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করেছে সিকিম প্রশাসন। প্রতিবেশী দেশ নেপালে হড়পা বানে (Nepal Floods) হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ও মানুষ নিখোঁজের ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে এই বাড়তি সতর্কতা জারি করা হল। ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর আশেপাশে তুষারধস, ভূমিধস অথবা অন্য দুর্যোগের কারণ হতে পারে এমন আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ডপলার আবহাওয়া রাডার স্থাপনের উপযুক্ত জায়গার খোঁজও চলছে।
জানা গিয়েছে, সিকিমে চিহ্নিত ৪০টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে ১৬টিকে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ১৩টি এখনও শ্রেণিবিন্যাসের অপেক্ষায় রয়েছে। শ্রেণিবিন্যাস করা হ্রদগুলোর মধ্যে সাতটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চিহ্নিত ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে ১৩টির বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।
সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সচিব সন্দীপ তাম্বে জানান, হ্রদের গভীরতা, জলের পরিমাণ, হিমবাহ-জনিত অবক্ষেপের (মোরেইন) স্থিতিশীলতা এবং তুষারধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি খতিয়ে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর জন্য বিপদ কমাতে সিকিম তিনটি বড় ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথমত ‘শাকো চু’ হ্রদে ভঙ্গুর মোরেইনের আড়ালে প্রায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হয়ে আছে। সৌরচালিত পাম্প ব্যবহার করে হ্রদের জলস্তর ২০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ। হ্রদ থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ ঘনমিটার জল অপসারণ করা হবে। এর ফলে মোরেইনটি ভেঙে পড়লে নিচের দিকে নেমে আসা জলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। উত্তর-দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদের ক্ষেত্রে নিচের দিকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে ডোলমা সাম্পাংয়ে পাথর দিয়ে বাধ তৈরির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নিচের দিকের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জল পৌঁছানোর আগে বন্যার তীব্রতা কমিয়ে আনা এই বাধের উদ্দেশ্য হবে। ২০২৩ সালের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়ের জেরে হড়পা বানের তীব্রতা কমাতে ডোলমা সাম্পাংয়ের ৩০০ হেক্টর এলাকা বেশ সহায়তা করেছিল। তৃতীয় প্রস্তাবটি গুরুডংমার হ্রদ এলাকাকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে। সেখানে হ্রদটির কোনও ক্ষতি না করে জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘মোরেইন প্লাগ’-এর (হিমবাহ তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ) কাছে একটি দেওয়াল নির্মাণের ভাবনা চিন্তা চলছে। সিকিম আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থাও করছে।
ইতিমধ্যে শাকো চু, কেরং এবং ডোলমা সাম্পাং-এ ইতিমধ্যে স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়েছে। এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর আশেপাশে তুষারধস, ভূমিধস বা অন্যান্য দুর্যোগের কারণ হতে পারে এমন আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ডপলার আবহাওয়া রাডার বসানোর জায়গার খোঁজ চলছে। কর্মকর্তাদের মতে, এই রাজ্যে ৪০০টিরও বেশি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি হ্রদকে বর্তমান মূল্যায়ন কর্মসূচির আওতায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড) আঘাত হানার পর এই নতুন মূল্যায়ন ও ঝুঁকি প্রশমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সেই ঘটনায় দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে তিস্তা নদী অববাহিকা দিয়ে জলের প্রবল স্রোত বয়ে গিয়েছিল, যার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।