বাঙালির যৌথচেতনায় কিছু ‘নাম’ কেবল ব্যক্তিপরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, সময়ের স্রোত পেরিয়ে তাঁরা হয়ে ওঠেন মিথ এবং সংস্কৃতির এক-একটি চিরন্তন প্রতীকে। যেমন ‘অরুণকুমার চ্যাটার্জি’, যিনি পরবর্তীতে বাংলা চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত ‘মহানায়ক’ হয়ে উঠলেন। আজ বাঙালির সেই চিরন্তন ‘ম্যাটিনি আইডল’-এর জন্ম শতবর্ষ (Uttam Kumar 100th Birth Anniversary)। বৃহস্পতিবার রাজ্যজুড়ে যখন উত্তম স্মরণের পালা চলছে, তখন মুর্শিদাবাদের ছোট্ট শহর জিয়াগঞ্জও মহানায়কের স্মৃতিতে বিভোর। বলা ভালো, সেখানকার ভাগীরথীর হাওয়ায় মিশে রয়েছেন মহানায়ক।
১৯৬৩ সাল। ফেব্রুয়ারি মাসের এক ভোরে জিয়াগঞ্জের এই ঘাটেই নৌকায় উঠেছিলেন উত্তম কুমার। উপলক্ষ্য ‘নিশীথে’ ছবির সেই নৌকার দৃশ্য। সুপ্রিয়া দেবী ঘোমটা দিয়ে বসে, আর উত্তম কুমার তাকিয়ে রয়েছেন ভাগীরথীর দিকে। ক্যামেরার পেছনে অগ্রদূত। কুয়াশা ভেদ করে একটা আলো এসে পড়ছে জলে। স্মৃতি হাতড়ে সেসব কথাই তুলে ধরলেন জিয়াগঞ্জের বৃদ্ধ মাঝি হারান মণ্ডল। অশীতিপর মাঝি বললেন, “আমার বাবার নৌকা নিয়েছিলেন ওঁরা। উত্তমবাবু আমার বাবাকে বলেছিলেন- মাঝি, একটু আস্তে চালাও, নদীটা দেখতে দাও।'” সেসব শুটিং কড়চা আজও জিয়াগঞ্জবাসীর ঘরে ঘরে মুখে মুখে ফেরে। হবে না-ই বা কেন? জিয়াগঞ্জ স্টেশনের পুরনো টিকিট ঘরের দেওয়ালে আজও জ্বলজ্বল করছে এক কালো দাগ। উত্তম স্মারক হিসেবে যা আগলে রেখেছেন এখানকার স্থানীয়রা। তাঁরাই বললেন, শুটিংয়ের দিন ওখানেই ভিড়ের চাপে হ্যাজাক লাইট উলটে গিয়েছিল। উত্তমকুমারকে চ্যাংদোলা করে বের করার সময় তাঁর সাদা পাঞ্জাবির একটা বোতাম ছিঁড়ে যায়। সেই বোতামটা নাকি বহুদিন একজনের কাছে ছিল। হয়তো আজও তা সযত্নে লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছে।
শুটিংয়ের ফাঁকে উত্তম কুমার বসতেন বালুচরের সিল্ক ব্যবসায়ীর গদিতে। চা খেতেন মাটির ভাঁড়ে। জিয়াগঞ্জের এক মিষ্টির দোকানের মালিক জানালেন, “দাদু বলতেন- উত্তমবাবু ছানাবড়া খেতে ভালোবাসতেন। একবার একসঙ্গে চারটেও খেয়েছিলেন।” শুটিংয়ের জন্য জিয়াগঞ্জে ছিলেন দিন চারেক। আর মাত্র এ ক’দিনেই জিয়াগঞ্জকে আপন করে নিয়েছিলেন বাঙালির মহানায়ক। ফেরার দিন স্টেশনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলেছিলেন, “আবার আসব।” কথা দিয়ে ভুলে যাননি কিন্তু, কথা রেখেছিলেন। ফিরেছিলেন কাঠগোলা বাগানে ‘সূর্যতপা’ নিয়ে। কাঠগোলা প্রাসাদে দুলাল গুহর ‘মেরা করম মেরা ধরম’ নিয়ে। আজ তাঁর জন্ম শতবর্ষে জিয়াগঞ্জের ঘাট একইভাবে দাঁড়িয়ে। নৌকাগুলোও বইছে নিজ ছন্দে। শুধু মানুষটা নেই, তবে আছে তাঁর নস্টালজিয়ায় বিভোর জিয়াগঞ্জবাসী। ভাগীরথীর প্রতিটি স্রোতে আজও লেখা- এখানে একবার মহানায়ক এসেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতেই শতবর্ষে মুর্শিদাবাদ জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর ওই ঘাটকে ‘উত্তমকুমার শুটিং স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা করেছে। জিয়াগঞ্জবাসীর দাবি, স্টেশনে একটি ফলক বসানো হোক, যেখানে লেখা থাকবে- ‘১৯৬৩ সালে এখানে মহানায়ক এসেছিলেন।’