ময়নাতদন্তের নাম করে দেদার ঘুষ নেওয়া চলত উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (North Bengal Medical College) মর্গে। ময়নাতদন্ত করার জন্য হোক কিংবা মৃতদেহ রাখার জন্য। সবকিছুতেই মর্গের কর্মীরা মৃতের পরিবারের কাছে টাকা চাইত। কিন্তু এবার সেই পর্দাফাঁস করল রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখা। ঘুষ নেওয়ার অপরাধে এক কর্মীকে গ্রেপ্তারও করে তারা। ধৃত ওই কর্মীর নাম বাবুল মল্লিক।
রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখা হাসপাতালের মর্গ চত্বরে একটি সুনির্দিষ্ট ফাঁদ পেতে ৩হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সময়েই বাবুল মল্লিক নামের এক ল্যাবরেটরি-কাম-মর্গ সহকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন তদন্তকারীরা। দীর্ঘদিন ধরেই ময়নাতদন্তের নথি পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবির অভিযোগ উঠছিল। নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরেই হাসপাতাল চত্বরে ছক কষে ওই কর্মীকে টাকা নেওয়ার মুহূর্তেই জালে তোলা হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মেডিক্যালে যেমন শোরগোল পড়েছে, তেমনই ময়নাতদন্তের কাজ নিয়ে চলা গভীর সিন্ডিকেটের অন্দরে থাবা বসাতে তদন্ত ত্বরান্বিত করেছে রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখা।
এই আকস্মিক অভিযানে বড়সড় সাফল্য আসায় স্বস্তির সুর শোনা গিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গলায়। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের সুপার কৌশিক ঈশোর এই কঠোর অবস্থানকে সরাসরি স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ঘুষ নিতে গিয়ে এক কর্মচারীর হাতেনাতে ধরা পড়ার খবরে আমি নিজে ভীষণ খুশি। যেসব আধিকারিকরা এই অ্যাকশনটা নিয়েছেন, তাঁদের আমি সাধুবাদ জানাই। ভবিষ্যতে দুর্নীতি দূর করতে এই ধরনের কড়া পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।”
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে হাসপাতালের পরিকাঠামো ও দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে ছিলেন বর্তমান সুপার। কাজের পরিবেশ সংস্কার করতে গিয়ে পদে পদে বাধার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, “মাত্র এক মাসের মধ্যে একাধিক বেপরোয়া কর্মীকে তিনবার শোকজ করা সত্ত্বেও তাঁদের আচরণে বিন্দুমাত্র বদল আসেনি। বরং হালকাভাবে উত্তর দিয়ে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা দেখা যেত। এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুরো হাসপাতাল জুড়েই একচেটিয়া সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিল বলে অভিযোগ। হাসপাতাল প্রশাসনকে কার্যত জিম্মি করার এক অদ্ভুত মানসিকতা বজায় রাখছিল এই চক্রটি। যখনই অভিযুক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হতো, তখনই তাঁরা কাজ বন্ধের হুমকি দিত।
প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে মৃতদেহ পরিবহন ব্যাহত হত এবং মর্গ চত্বরে মৃতদেহ জমতে শুরু করত। বিকল্প হিসেবে কন্ট্রাকচুয়াল ‘সাথী’ স্টাফদের দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে কিছু প্রশাসনিক ঝুঁকি থাকায় সুযোগ বুঝে ওই স্থায়ী কর্মচারীরা বারবার হাসপাতাল অচল করার ব্ল্যাকমেল করত। তবে এবার আর কোনও ছাড় নয়। গ্রেপ্তার হওয়া বাবুল মল্লিকের পাশাপাশি জড়িয়ে থাকা বাকিদের বিরুদ্ধেও স্বাস্থ্যভবন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দপ্তরে বিশদ রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে, যাতে সরাসরি সাসপেনশন বা কঠোর বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কলেজের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ফরেন্সিক বিভাগের সামগ্রিক বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং সেই রিপোর্ট খুব শীঘ্রই প্রিন্সিপালের কাছে জমা পড়তে চলেছে। ধৃত মর্গ সহকারীকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে দুর্নীতি দমন শাখা পুরো সিন্ডিকেটের উৎস খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।