পুজোয় লম্বা ছুটি। প্ল্যান আগেই ছকে নেওয়া ছিল। বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে রেলপথে সোজা পৌঁছে গিয়েছেন শিলিগুড়ি বা এনজেপি স্টেশন। হাল্কা ব্রেকফাস্ট সেরে এ বার পাহাড়ে ওঠার পালা। ‘খাদের ধারের রেলিংটা…’ গুনগুন করতে করতে গাড়ির স্ট্যান্ডের দিকে এগোচ্ছেন, তবে মনে একটা খটকা থেকে গিয়েছে। সমতলের স্ট্যান্ড থেকে নেওয়া গাড়িটি নিয়েই পুরো ভ্রমণসূচি সাজাতে পারবেন? নাকি পাহাড়ে গিয়ে অন্য গাড়ি ভাড়া করতে হবে? দোটানা রয়েই যায়। পুজোর আগেই সেই সমস্যা মেটাল প্রশাসন। পুলিশের নির্দেশে আপাতত সমতলের গাড়ির চালক পর্যটকদের পাহাড়ের স্থানীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলি ঘুরিয়ে দেখাতে পারবেন।
পাহাড় ও সমতলের গাড়ি চালকদের এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। পাহাড়ের চালকদের দীর্ঘদিনের দাবি, সমতলের চালকদের একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে পর্যটকদের নামিয়ে চলে ?যেতে হবে। পাহাড়ের অন্য পর্যটন স্থানগুলিতে পর্যটকদের ঘোরাবেন শুধুমাত্র পাহাড়ের গাড়ি চালকরাই। উল্টো দিকে সমতলের চালকের দাবি ছিল, পাহাড়ে উঠলেই নির্জন, ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে তাদের হেনস্থা করা হচ্ছে। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিবাদ চরমে ওঠে গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে।
অগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে পাহাড়ের গাড়ি চালকদের সংগঠন 'সংযুক্ত চালক মঞ্চ'-এর তরফ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, পয়লা সেপ্টেম্বর থেকে সমতলের কোনও গাড়ি আর পাহাড়ে sightseeing বা পার্শ্বস্থ এলাকা ঘুরে দেখাতে পারবে না। সমস্যা বাড়ে সেখানেই। সাধারণত, অধিকাংশ পর্যটক এখন আগাম বুকিং করেই পাহাড়ে বেড়াতে আসেন। হোটেলের পাশাপাশি তাঁরা গাড়িও বুক করে নেন। বুক করা গাড়িতে চড়েই তাঁরা পাহাড়ে পৌঁছনোর পরে sightseeing করে শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন। পাহাড়ে সমতলের চালকেরা সন্নিহিত অন্যান্য় এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতে না পারলে বুকিং পাবেন না। এই সমস্যার সমাধানে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভলপমেন্ট নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে পুলিশি হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়। পাহাড় ও সমতলের চালকদের এই বিরোধে পর্যটন ব্যবসা মার খাওয়ারই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
নেপালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে পর্যটকদের পুজোর বুকিং উত্তরবঙ্গের দিকে অনেকটা সরে এসেছে। উত্তর সিকিমের লাচেনেও যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় পর্যটকদের ভিড় বাড়বে বলে আশা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যেই চালকদের বিবাদ পর্যটন ব্যবসায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। দার্জিলিঙের এক পর্যটন ব্যবসায়ী অমিয় কর্মকার বলেন, ‘চালকদের এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। এ রকম চলতে থাকলে পুজোর সময়েও আমাদের সমস্যায় পড়তে হতো।’
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সমস্যা দূর হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংযুক্ত চালক মঞ্চের তরফে বিধান তামাং বলেন, ‘পাহাড়ের গাড়ি চালকদের স্বার্থে আমরা আশেপাশের এলাকা ঘুরিয়ে দেখানোর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে চেয়েছিলাম। পুলিশের হস্তক্ষেপে আপাতত সেটা স্থগিত রাখা হয়েছে।’ জেলা পুলিশের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নেটওয়ার্কও। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তন্ময় গোস্বামী বলেন, ‘একই জেলার মধ্যে পাহাড়ের গাড়ি শিলিগুড়িতে চলাচল করতে পারবে না, সমতলের গাড়ি পাহাড়ে চলতে পারবে না বলে কোনও নিয়ম চালু করাটা ভুল সিদ্ধান্ত হতো। এর ফলে নিজেদের মধ্যে অহেতুক বিরোধ সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হতো। পুলিশি হস্তক্ষেপে আপাতত সমস্যা মিটেছে।’
গাড়ি চালকদের মধ্যে একই সমস্যা সিকিম বনাম বাংলার মধ্যেও রয়েছে। সিকিমের গাড়ি চালকেরা শিলিগুড়ি-সহ গোটা উত্তরবঙ্গে অবাধে চলাচল করলেও সমতলের চালকদের সেই সুযোগ নেই। তাঁদের গ্যাংটকে পর্যটকদের নামিয়েই ফিরতে হয়। এই বিরোধ মেটাতে দুই রাজ্যের পরিবহণ আধিকারিকেরা আলোচনা করছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।