• ​ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইট: পাইলটের রক্তে সাইকোঅ্যাক্টিভ পদার্থ, প্রাথমিক রিপোর্টে আর কী জানা গেল?
    এই সময় | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনার তদন্তে উঠে এল চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। বিমানটির পাইলট-ইন-কম্যান্ডের (প্রধান পাইলট) রক্ত পরীক্ষায় 'সাইকোঅ্যাক্টিভ' (মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে এমন ড্রাগ) পদার্থের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)-এর প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (DGCA)-কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    ​গত ৪ অগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার AI 2379 ফ্লাইটটি থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে দিল্লি যাচ্ছিল। ফ্লাইটে মোট ১৪৫ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য ছিলেন। মাঝ আকাশে ৩৬,০০০ ফুট উঁচুতে থাকার সময়ে ফ্লাইটটি ওডিশার আকাশে আচমকাই ৩০০ ফুট নীচে নেমে যায়। ফ্লাইটের এই আকস্মিক পতনে ভিতরে তীব্র ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়, যার ফলে যাত্রী ও কেবিন ক্রু মিলিয়ে মোট ২৪ জন আহত হন এবং তাঁদের মধ্যে ৪ জনের আঘাত ছিল গুরুতর।

    ​অবতরণের পরে বিমানের দু’জন পাইলটেরই ব্রিদিং অ্যানালাইজার পরীক্ষা করা হয়। তা স্বাভাবিক আসে। তবে পরবর্তী সাইকোঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্স স্ক্রিনিং এবং ল্যাবে পরীক্ষায় মুখ্য পাইলটের রক্তে মারিজুয়ানা বা গাঁজার উপস্থিতি সুনিশ্চিত হয়। অবশ্য সহ-পাইলটের সমস্ত পরীক্ষার ফল নেগেটিভ ছিল। ক্রু মেম্বারদেরও রিপোর্ট স্বাভাবিক ছিল। তবে প্রধান পাইলটের মারিজুয়ানা সেবনের বিষয়টি নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। এই ঘটনায় যাত্রী সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়ায় DGCA-কে কঠোর আইনি ও নজরদারিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্তকারী সংস্থা (AAIB)।

    ​তদন্ত রিপোর্টে বিমানটির আকস্মিক উচ্চতা হারানোর পিছনের প্রযুক্তিগত কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ওড়ার সময়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিমানটির তিনটি হাইড্রোলিক সিস্টেমেরই (গ্রিন, ব্লু ও ইয়েলো) প্রেসার বা চাপ আকস্মিকভাবে কমে যায়। এর ফলে অটো-পাইলট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং 'স্টল ওয়ার্নিং' চালু হয়ে যায়।

    Airbus-এর প্রাথমিক ডেটা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় চার সেকেন্ডের জন্য তিনটি হাইড্রলিক সিস্টেমের একাধিক ত্রুটির কারণে পাইলটের কোনও নির্দেশ ছাড়াই তার এলিভেটর ও এইলেরনগুলো নিজে থেকেই কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফ্লাইট কন্ট্রোল সারফেসগুলোর পরিচালনার জন্য হাইড্রোলিক সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— এলিভেটর যা বিমানের নাককে উপরে বা নীচে ওঠা-নামা করে। এইলেরন (aileron) যা ডানার সামনের অংশকে কাত করে বিমানটিকে ডানে বা বামে ঘোরায়, এবং স্পয়লার যা উড়োজাহাজের উত্তোলন শক্তি কমায় ও বায়ুপ্রতিরোধ বাড়িয়ে বিমানটিকে নীচে নামতে বা গতি কমাতে সাহায্য করে। গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রোল সারফেস-এর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাইলটদের হাতে উড়ানের pitch ও roll-এর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। যদিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাইড্রোলিক সিস্টেম আবার সচল হয় এবং বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়, কিন্তু কেবিনে সিটবেল্ট সাইন বন্ধ থাকায় এই ঘটনার সময়ে প্রবল ঝাঁকুনিতে যাত্রীরা ছিটকে পড়েন।

    ঘটনার পরে ফ্লাইটটি অন্য কোথাও জরুরি অবতরণ না করে দিল্লিতে নিরাপদে পৌঁছয়। তার পরেই যাত্রীদের চিকিৎসার ব্যবহার করা হয় । তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মূল পাইলটের সাইকোঅ্যাক্টিভ পদার্থ ব্যবহারের সঙ্গে হাইড্রোলিক ত্রুটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। বর্তমানে AAIB-এর পাশাপাশি এয়ারবাস ও ফ্রান্সের বিমান নিরাপত্তা পর্যালোচকদের একটি দল দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করতে বিশদ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

    ১. Air India AI2379 ফ্লাইটে কী ঘটেছিল?

    ফুকেট থেকে দিল্লিগামী Air India AI2379 বিমানটি প্রায় ৩৬,০০০ ফুট উচ্চতায় ওড়ার সময় আচমকা প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে যায়। তীব্র ঝাঁকুনিতে ২৪ জন যাত্রী ও ক্রু আহত হন।

    ২. বিমানের প্রধান পাইলটের রক্তে কী পাওয়া গিয়েছিল?

    প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রধান পাইলটের রক্ত পরীক্ষায় সাইকোঅ্যাক্টিভ পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়। রিপোর্টে মারিজুয়ানা বা গাঁজার উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

    ৩. পাইলটের ব্রেথ অ্যানালাইজার পরীক্ষার ফল কী ছিল?

    বিমান দিল্লিতে অবতরণের পর দু’জন পাইলটেরই ব্রেথ অ্যানালাইজার পরীক্ষা করা হয় এবং দু’টির ফলই স্বাভাবিক আসে। পরবর্তী সাইকোঅ্যাক্টিভ সাবস্ট্যান্স স্ক্রিনিং ও ল্যাব পরীক্ষায় প্রধান পাইলটের রক্তে ওই পদার্থের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

    ৪. সহ-পাইলটের পরীক্ষার ফল কী ছিল?

    সহ-পাইলটের সমস্ত পরীক্ষার ফল নেগেটিভ ছিল। অন্যান্য ক্রু সদস্যদের পরীক্ষার ফলও স্বাভাবিক আসে।

    ৫. বিমানটির আচমকা উচ্চতা কমে যাওয়ার প্রযুক্তিগত কারণ কী ছিল?

    প্রাথমিক তদন্তে দেখা গিয়েছে, কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিমানের তিনটি হাইড্রলিক সিস্টেম—গ্রিন, ব্লু এবং ইয়েলো—একসঙ্গে চাপ হারিয়েছিল। এর ফলে বিমানটির গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট কন্ট্রোল ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়।

    ৬. হাইড্রলিক সিস্টেমের সমস্যা হলে কী হয়?

    বিমানের এলিভেটর, এইলেরন ও স্পয়লারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রোল সারফেস পরিচালনায় হাইড্রলিক সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাময়িক হাইড্রলিক সমস্যার কারণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাইলটরা বিমানের pitch ও roll-এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন বলে প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

    ৭. ঘটনায় কতজন আহত হয়েছিলেন?

    মোট ২৪ জন যাত্রী ও কেবিন ক্রু আহত হন। তাঁদের মধ্যে চার জনের আঘাত গুরুতর ছিল।

    ৮. পাইলটের সাইকোঅ্যাক্টিভ পদার্থের ব্যবহার এবং হাইড্রলিক সমস্যার মধ্যে কি সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে?

    না। প্রাথমিক তদন্তে দু’টি বিষয়ই সামনে এলেও পাইলটের রক্তে সাইকোঅ্যাক্টিভ পদার্থের উপস্থিতির সঙ্গে বিমানের হাইড্রলিক বিকলতার সরাসরি কোনও সম্পর্ক এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।

    ৯. বিমানটি কি জরুরি অবতরণ করেছিল?

    না। ঝাঁকুনির ঘটনার পর বিমানটি অন্য কোনও বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ না করে দিল্লিতে নিরাপদে পৌঁছয়। অবতরণের পর চিকিৎসাকর্মীদের প্রস্তুত রাখার জন্য বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছিল।

    ১০. ঘটনার তদন্ত কে করছে?

    এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো বা AAIB তদন্ত করছে। পাশাপাশি Airbus এবং ফ্রান্সের বিমান নিরাপত্তা পর্যালোচকদের একটি দলও ঘটনার মূল কারণ খতিয়ে দেখছে।

  • Link to this news (এই সময়)