উভয় সংকটে গৌড়বঙ্গ, জলস্তরে টান ধরলে গঙ্গার করাল গ্রাসে পালটে যাচ্ছে মালদহের বসতি এলাকার মানচিত্র। অন্যদিকে জলস্তর বাড়তে ভাঙছে বাঁধ। ভাসছে একের পর এক গ্রাম। ইতিমধ্যে ভূতনির বাঁধ ভেঙে ভেসেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রায় দু’লক্ষ মানুষ বন্যাতঙ্কে দিশাহারা। উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে রিপোর্ট তলব করেছে নবান্ন। রাজ্যের সেচ প্রতিমন্ত্রী, জেলাশাসক, পুলিশ সুপার-সহ প্রশাসনের আধিকারিকরা ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়েছেন৷
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার মালদহ জেলা প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেছেন, কানপুর আইআইটি, বিশেষজ্ঞ টিম, জলশক্তি মন্ত্রক এবং বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ তিন রাজ্যের মধ্যে কো-অর্ডিনেশন মিটিং করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। গঙ্গা ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী সমাধান হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। বন্যা রোধ ও গঙ্গা ভাঙন রোধে এনডিএম (ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট) এবং রাজ্য তহবিলের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও অতিরিক্ত তহবিলের আবেদন জানানো হয়েছে।
প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভূতনির কেশরপুর কালুটোনটোলা এলাকার নদী বাঁধ ও রিং বাঁধের একাংশ জলের তোড়ে ভেঙে যায়। বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে গঙ্গার জল ভূতনির সংরক্ষিত ও লোকালয়ে ঢুকেছে। বিপর্যয়ে ভূতনি অঞ্চলের প্রায় ২ লক্ষ মানুষ বন্যার কবলে। নিচু এলাকার বহু বাড়িঘর ও কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার মুখে রয়েছে। এবারও কি পুজোর মুখে বড় ধরনের বন্যার ধাক্কা সইতে হবে? শুক্রবার সকাল থেকে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে উঁচু রিং বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হলেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। পরিস্রুত পানীয় জলের সংকট তীব্র হয়েছে।
বাঁধের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। বাঁধ ভাঙার পর রাজ্যের সেচ প্রতিমন্ত্রী জয়েল মুর্মু, জেলাশাসক রাজনবীর সিং, পুলিশ সুপার অনুপম সিং-সহ প্রশাসনের আধিকারিকরা ভাঙন ও বন্যা কবলিত এলাকাগুলিতে যান। রতুয়া-১ ব্লক সহ ভূতনি ও মানিকচকের বন্যা ও নদীভাঙন পরিস্থিতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তাঁরা। দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, ফ্লাড রিলিফ সেন্টার চালু, নিরাশ্রয় মানুষের জন্য রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা, পানীয় জল ও শৌচাগারের ব্যবস্থা, মেডিক্যাল ক্যাম্প, জেনারেটর, সিভিল ডিফেন্স মোতায়েন, নৌকার ব্যবস্থার বিষয়ে ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকদের দিনরাত প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন সেচ প্রতিমন্ত্রী।
জেলাশাসক জানান, রতুয়া-১ ব্লকের কাটাহা দিয়ারা এলাকায় দুর্গত মানুষজনের কাছে প্রতিদিন রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে৷ একই সঙ্গে ত্রিপল, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট কিট, স্পেশাল জিআর চাল, চিঁড়ে-গুড়-সহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী বিতরণ চলছে। এলাকার ফ্লাড শেল্টারগুলি চালু করা হয়েছে৷ বন্যা কবলিত এলাকা থেকে মানুষজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ যে এলাকায় নদীভাঙন চলছে সেখানে বালির বস্তা, প্রোকোপাইন প্রযুক্তির সাহায্যে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে৷ গঙ্গার জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় ভূতনি রিং বাঁধের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে৷ নিচু বাঁধ বাঁচিয়ে রাখার সবরকম চেষ্টা চলছে৷ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি দপ্তরকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে গঙ্গার জলোচ্ছ্বাসে ভূতনির কেশরপুর কালুটোনটোলা এলাকার নদী বাঁধ ও রিং বাঁধের একাংশ ভেঙে যাওয়ার পরই নবান্ন থেকে পরিস্থিতি জানতে রিপোর্ট তলব করা হয়। শুক্রবার সেই রিপোর্ট পাঠিয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিপর্যয় মোকাবিলার কথা জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসনকে গঙ্গা ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।