এই সময়, খড়্গপুর: স্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ মেলেনি। কিন্তু তাতে কী! টিউশন দিয়েই অজস্র পড়ুয়ার শিক্ষক তিনি। শুধু শিক্ষকই নন, গরিব ও মেধাবী পড়ুয়াদের কাছে তিনি ‘ত্রাতা’ও বটে। কারণ, শিক্ষককে সাম্মানিক না-দিতে পারলেও পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হননি তাঁরা। বেসরকারি সংস্থা থেকে শিক্ষক দিবসের আগে পেয়েছেন ‘শিক্ষক সম্মান’ও। তিনি ডেবরার বাংলা শিক্ষক মানস আচার্য।
বাংলায় এমএ, বিএড মানস স্কুল সার্ভিস কমিশনের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন ২০০৩-এ। তবে ইন্টারভিউয়ের পরে চাকরির তালিকায় নাম ছিল না। সে বছর থেকেই টিউশন দিতে শুরু করেন। পঞ্চম শ্রেণি থেকে এমএ ক্লাসের পড়ুয়াদের পড়ান। এখন পড়ুয়ার সংখ্যা ২৬০ জন!
মানের কাছে টিউশন নিয়ে বর্তমানে ইংরেজির শিক্ষক কৌশিক দোলাই। তাঁর কথায়, ‘স্যর না-থাকলে কত গরিব পড়ুয়া যে টিউশন থেকে বঞ্চিত হতো, তা বলে শেষ করা যাবে না। স্যর আছেন বলেই ডেবরা এলাকার অভিভাবকরা নিশ্চিন্তে থাকেন।’ আর মানস বলছেন, ‘টাকা না-দিতে পারলে পড়াব না, তা তো হতে পারে না। প্রতি বছরই গড়ে প্রায় ৫০ জনের মতো পড়ুয়া টাকা দিতে পারে না। আবার অনেকে কম টাকাও দেয়। আমি কিন্তু সব পড়ুয়াকে সমান দৃষ্টিতেই দেখি।’
তাঁর কাছেই পড়েন এমএ-র ছাত্রী, ধামতোড়ের বাসিন্দা মৌমিতা বেরা, কবিতা মণ্ডল। তাঁর কাছে পড়েই এখন ভিলেজ রিসোর্স পার্সন হিসেবে কাজ করছেন মাধবপুরের গীতা মাইতি। গীতার কথায়, ‘আমরা ভীষণ গরিব ছিলাম। টিউশনের খরচ জোটানোর টাকা ছিল না। স্যর নিখরচায় পড়িয়েছেন।’ গাড়িচালক অপরেশ মাইতি বলেন, ‘আমার তিন মেয়ে স্যরের কাছে পড়ে। কারও জন্য টাকা নেন না। তবেই তো মেয়েদের পড়াতে পারছি।’ বাবার সেলুন দোকান। টিউশন খরচ জোটানোর সামর্থ্য নেই। তবু পঞ্চম শ্রেণি থেকে এখন নবম শ্রেণিতে এসেও নিখরচায় টিউশন পড়ছেন সুশান্ত সামই। আর তাঁর এই কাজের জন্য ডেবরার প্রতিটি মানুষের কাছে তিনি এখন ভীষণ জনপ্রিয় ও পরিচিত মুখ। যে কারণে একটি নামী প্রকাশনা সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে ২০২৬-এ শিক্ষক সম্মানও দেওয়া হয়েছে।
টিউশন দিয়েই শিক্ষক হিসেবে এমন মর্যাদা পাওয়ায় খুশি মানস। স্কুলে শিক্ষকতা করতে না-পারার আক্ষেপও তাঁর নেই। নিখরচায় পড়ানোর বাইরেও বিভিন্ন সামাজিক কাজেও তাঁর অবদান রয়েছে। যে কেউ সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালে সহজে ফেরান না। মানস বলেন, ‘মানুষ সমস্যায় পড়লেই তো সাহায্যের জন্য আসে। তাই সাধ্য মতো চেষ্টা করি। এ ভাবেই পড়ুয়াদের নিয়ে জীবন কাটাতে চাই। আমার টোলে পড়া পড়ুয়ারা প্রতিষ্ঠিত হলেই আমার আনন্দ। স্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ পাইনি। কিন্তু, হাজার হাজার পড়ুয়াকে টিউশন দিয়েই আমার স্বপ্নপূরণ হয়েছে।’