নয়াদিল্লি: পড়ুয়া নয়, দুষ্কৃতী। যন্তরমন্তর এবং সংসদ অভিযানে দল ভারী করেছিল খুন-ধর্ষণে অভিযুক্ত দুষ্কৃতীরাই। এই দাবি ছিল দিল্লি পুলিশের। তীব্র প্রতিবাদ করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি সহ বিরোধীরা। কিন্তু তাদের যুক্তির পক্ষে পুলিশের অস্ত্র ছিল অত্যাধুনিক ‘ফেসিয়াল রেকগনিশন সফ্টওয়্যার’। তা দিয়েই নাকি ‘চিহ্নিত’ হয়ে গিয়েছে ওই দাগিরা। তাদের বিরুদ্ধে এফআইআরও রুজু হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবটা কী ছিল? সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ তাদের অন্তর্তদন্তে দাবি করেছে, অন্তত ২৫ জন ‘চিহ্নিত’ দুষ্কৃতী ওই আন্দোলনের সময় জেলেই ছিল। তাদের আন্দোলনে থাকা সম্ভব নয়। জেল ও আদালতের নথির ভিত্তিতে প্রকাশ্যে আসা এই বিস্ফোরক তথ্যে তোলপাড় পড়েছে দিল্লির দরবারে। সরব হয়েছে বিরোধীরাও। তাদের প্রশ্ন, তবে কি সুপ্রিম কোর্টে মিথ্যা তথ্য পেশ করেছে অমিত শাহের পুলিশ?
দেশজুড়ে নিট প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে সব এফআইআর গত মঙ্গলবারই খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে দিল্লি পুলিশ এফআরএস-এর মাধ্যমে খুন, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ ও শিশুদের যৌন নিগ্রহে অভিযুক্ত যে ২ হাজার ৮৭৩ জনের তালিকা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে শীর্ষ আদালতের আপত্তি নেই। কারণ, তাদের নামে গুরুতর অপরাধের অতীত রেকর্ড রয়েছে। দিল্লি পুলিশও ইতিমধ্যে অবস্থান স্পষ্ট করেছে যে, শুধুমাত্র ‘ফেসিয়াল রেকগনিশন’ নয়, ‘ফিল্ড ভেরিফিকেশন’ বা সরেজমিনে খতিয়ে দেখে তবেই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই কাজ এখনও বাকি। তাহলে কি কোনোরকম যাচাই না করে যন্তরমন্তরে জেন জি বিক্ষোভে দুষ্কৃতী-তত্ত্ব আমদানি করেছিল দিল্লি পুলিশ? ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর দাবি, হলফনামায় যে ২ হাজার ৮৭৩ দাগি অপরাধীকে শনাক্ত করার দাবি করেছে দিল্লি পুলিশ, তাদের মধ্যে ২০৫ জনের বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজখবর করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০১ জনের বিরুদ্ধে খুন, ৬১ জনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, ৬ জনের বিরুদ্ধে শিশুদের নিগ্রহ, ৩৭ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অন্তর্তদন্তে ধরা পড়েছে, সিজেপির প্রতিবাদ চলাকালীন এরকম অন্তত ২৫ জন দাগি দিল্লির রাজপথে নয়, ছিল তিহার, মান্ডোলি ও রোহিণী জেলে। এই ২৫ জনের মধ্যে ১৭ জনের নামে খুন, ৪ জনের বিরুদ্ধে পকসো মামলা সহ ধর্ষণ ও ৪ জনের নামে খুনের চেষ্টার মামলা রয়েছে। ওই প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, এই দাগিদের তিনজনকে এফআরএস প্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশ শনাক্ত করেছিল ২১, ২৪ ও ২৫ জুলাই। একজনকে শনাক্ত করা হয়েছিল সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচির শেষদিন অর্থাৎ ২৬ জুলাই।
গত ১৭ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামা অনুসারে, দিল্লি পুলিশের বায়োমেট্রিক ডেটাবেস ‘ক্রাইম কুণ্ডলী-র মাধ্যমে ২ হাজার ৪০২ জনকে এবং অপরাধমূলক রেকর্ডের মাধ্যমে ৪৭১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। সেই অপরাধীদের মধ্যে একজন রাজধানীর একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত। দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকা গ্রেটার কৈলাস-১-এ জিমের মালিক নাদির শাহ হত্যাকাণ্ডে ধৃত সেই যোগেশ ওরফে রাজু গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই ও হাসিম বাবার সিন্ডিকেটের একজন শার্পশ্যুটার। পুলিশের সঙ্গে গুলির বিনিময়ের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। যে সময় তার বাঁ পায়ে গুলি লাগে। সেই রাজুকেও যন্তরমন্তরে দেখতে পেয়েছে দিল্লি পুলিশের ক্যামেরা। এই তথ্য যদি আদালতে প্রমাণিত হয়, তাহলে বড়োসড়ো সমস্যায় পড়তে চলেছে পুলিশ-প্রশাসন। ইতিমধ্যেই পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে এফআইআর তাদের খারিজ করতে হয়েছে। উপরন্তু পড়ুয়াদের ভুয়ো মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগে আদালতে মুখ পুড়ছে ডবল ইঞ্জিন বাহিনীর। এবার তাই নজরে যন্তরমন্তর এবং ‘বানানো’ দুষ্কৃতী-চিত্র!