মৃত্তিকা ভট্টাচার্য
১৯৩১। উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল পর্বতমালার কামেট শৃঙ্গ জয় করে ফিরছিলেন পর্বতারোহী-উদ্ভিদবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্মিথ ও তাঁর সহযাত্রীরা। জাস্কার ভ্যালি হয়ে নামার সময়ে পথ হারিয়ে তাঁরা ঢুকে পড়লেন ভুইন্দার উপত্যকায়! সেই অজানা ভ্যালিতে ফুলের সৌন্দর্যে ‘হারিয়ে’ ক্যাম্প করে কাটিয়ে দিলেন দু’দিন। নাম দিলেন ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’। স্থানীয়রা ডাকেন ‘ফুলোঁ কী ঘাটী’।
হরিদ্বার থেকে দেবপ্রয়াগ-যোশীমঠ পেরিয়ে গোবিন্দঘাট হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় সেই ফুলোঁ কী ঘাটী-র চেকপয়েন্ট পুলনায়। সেখান থেকে শুরু ট্রেক। গঙ্গা, অলকানন্দার সঙ্গে পথ পেরিয়ে এ বার সঙ্গী পুষ্পবতী নদী। চামোলি জেলার পুলনা থেকে ১২-১৩ কিলোমিটারের আপহিল ট্রেক। মূলত মনসুন ট্রেক। বর্ষায় স্নান করা পাথুরে রাস্তা আর পর্বতের মাথায় জমে থাকা মেঘের চাদর সঙ্গী করে হাঁটা। খানিক বৃষ্টি, ঘোড়ার ঘণ্টার টুংটুং শব্দ সঙ্গে নিয়ে ৬-৭ কিলোমিটার পেরোতেই একদম সামনে চলে এল পুষ্পবতী। চোখ-মুখে নদীর ঝাপটায় আরাম পায় হাঁপ ধরা শরীর। নদী পেরিয়েই ভুইন্দার ভ্যালি। সেখান থেকে আরও পাঁচ কিলোমিটার মতো ট্রেক করে বেসক্যাম্প ঘাঙ্গারিয়া গ্রাম।
ঘাঙ্গারিয়া থেকে একদিকে চলে গিয়েছে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের রাস্তা আর অন্য দিকে হেমকুণ্ড সাহিব (বিশ্বের উচ্চতম গুরুদ্বার)। সমুদ্রতল থেকে ৩,৬৫৮ মিটার উচ্চতায় নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ার রিজ়ার্ভের অন্তর্গত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ন্যাশনাল পার্কটি ইউনেস্কো হেরিটেজ। ঘাঙ্গারিয়ায় থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে, খাবার প্যাক করে ভ্যালির গেটে পৌঁছে, করিয়ে নিতে হবে রেজিস্ট্রেশন। গেট খোলে সাতটায়। চার্টবোর্ডে নানা অজানা ফুল আর মানচিত্রের সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হয়ে ট্রেক শুরু। শুরু থেকেই নানা পাহাড়ি-বুনো ফুল।
পুষ্পবতীর কলবর আর জঙ্গল থেকে আসা একটানা পাখি-পতঙ্গের ঝিঁঝিঁ শব্দকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা। এখানের রাস্তা ঘাঙ্গারিয়ার মতো বাঁধানো নয়, বরং অধিকাংশ পাথরই আলগা। পাঁচ কিলোমিটার মতো আপহিল ট্রেকে কখনও দু’পাশের জঙ্গলের থ্রিল আবার কখনও খাদের ধার থেকে দেখা মন মাতানো উপত্যকার ভিউ। মাঝে ঠান্ডা জলে একটু প্রাণ জুড়িয়ে নেওয়া। এ ভাবেই পৌঁছে যাওয়া ফুলোঁ কী ঘাটীতে। যেন সাদা-গোলাপি ফুলের গালিচা পাতা। ৫০০-র বেশি প্রজাতির ফুলের বাস সেখানে। দেখা মিলল মাউন্টেন অ্যাঞ্জেলিকা, ব্লু পপি, হিমালয়ান বালসাম (গোলাপি ও হলুদ), আর্নিকা হিমালয়ান সানফ্লাওয়ার, ইয়েলো ড্যানডেলিয়ন, পাঙ্কি ভায়োলেট মুন, রোজ়ানে, হোর্লফ্লাওয়ার, ফ্লেবেন— আরও কত নাম জানা-না জানা ফুল। ভ্যালি থেকে এক-দেড় কিলোমিটার মতো দূরে রয়েছে একটি রিভারবেড। ঘুরে দেখে একই পথে ফিরে আসা, বিকেল পাঁচটার মধ্যে।
খেয়াল রাখতে হবে