আপনার হাতে আপনারই আধার কার্ড। নিজের আধার নম্বর আপনি নিজেই দিলেন। নিজের আঙুলের ছাপও দিলেন নিজের হাতে। তারপর নিশ্চিত হলেন—টাকা তো আপনারই অ্যাকাউন্ট থেকে উঠছে! কিন্তু কিছুদিন পর যদি জানতে পারেন, আপনার সেই আধার নম্বর আর আপনার আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে আসলে অন্য একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উধাও হয়ে গিয়েছে? আরও ভয়ঙ্কর ব্যাপার, যাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটা গেল, তাঁর আধার নম্বরও নাকি আপনারটার সঙ্গে হুবহু এক! তাহলে আপনার আধারটা কার? আপনার আঙুলের ছাপই বা কোন অ্যাকাউন্টের দরজা খুলছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একজন মানুষের পরিচয় কীভাবে আর একজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে জুড়ে গেল?
আর এমনই একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে ঘটনাটি পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষ ব্লকের বাদুলিয়া এবং রায়না-1 ব্লকের পলাশন এলাকার। দুই মহিলার নাম একই—ঝর্ণা দাস। কিন্তু শুধু নামেই মিল নয়, সামনে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি। দুই মহিলার আধার নম্বরের 12টি সংখ্যাই নাকি হুবহু এক। আর সেই আধার নম্বর ও বায়োমেট্রিকের জেরেই এক মহিলার হাতে চলে এসেছে অন্য মহিলার অ্যাকাউন্টের 27 হাজার টাকা।
গল্পের শুরু পলাশনের বাসিন্দা ঝর্ণা দাসকে দিয়ে। গত 10 জুলাই তিনি আধার কার্ড হাতে নিয়ে যান পলাশন বাজারের এক দোকানে। সেখানে নিজের আধার নম্বর দেন, নিজের আঙুলের ছাপ দেন। তারপর সিএসপি থেকেই তোলেন টাকা। একদিন নয়, পরপর 10, 11 এবং 12 জুলাই—তিন দিনে মোট 27 হাজার টাকা তোলেন তিনি। তাঁর কাছে সবটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি তো নিজের পরিচয় দিয়েই নিজের টাকা তুলেছেন! কিন্তু কয়েকদিন পরেই সেই স্বাভাবিক ছবিটা যেন আচমকাই বদলে গেল। 3 অগস্ট হঠাৎ করে ওই সিএসপি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় আরবিআই। কেন? কী এমন ঘটেছে? সিএসপি-র কর্ণধার শেখ জাহিরুল যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নিজের কোম্পানির সঙ্গে। সেখান থেকে যে উত্তর আসে, তাতেই যেন পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার মতো অবস্থা—সিএসপি থেকে 27 হাজার টাকার প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে!
জাহিরুল তখন যোগাযোগ করেন পলাশনের ঝর্ণা দাসের সঙ্গে। ঝর্ণার বক্তব্য শুনে আরও ধন্দ তৈরি হয়। তিনি তো নিজেই সিএসপিতে গিয়েছিলেন। নিজের আধার নম্বর দিয়েছেন। নিজের আঙুলের ছাপ দিয়েছেন। নিজের সামনেই টাকা তুলেছেন। তাহলে প্রতারণা হল কোথায়? তদন্ত করতে গিয়ে সামনে আসে আসল বিস্ফোরক তথ্য। খণ্ডঘোষের বাদুলিয়ার আর এক ঝর্ণা দাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেই কাটা গিয়েছে সেই 27 হাজার টাকা। অর্থাৎ, একজন মহিলা টাকা তুলেছেন নিজের পরিচয় দিয়ে, অথচ টাকা গিয়েছে অন্য একজনের অ্যাকাউন্ট থেকে! তারপর ব্যাংকে যোগাযোগ করতেই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। ওয়েস্ট বেঙ্গল গ্রামীণ ব্যাংকের বাদুলিয়া শাখায় খতিয়ে দেখে জানা যায়—দুই ঝর্ণা দাসের আধার নম্বরের 12টি সংখ্যাই নাকি এক! একই নাম, একই আধার নম্বর—তাহলে দুই আলাদা মানুষ কীভাবে? আর বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের পরেও কীভাবে একজনের আঙুলের ছাপে অন্যজনের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা বেরিয়ে গেল? প্রশ্নের উত্তর এখনও ধোঁয়াশায়। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—এই ঘটনা শুধু 27 হাজার টাকা চলে যাওয়ার গল্প নয়। আধার, আঙুলের ছাপ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো সাধারণ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ও নিরাপত্তার ব্যবস্থার মধ্যে কোথাও যে ভয়াবহ বিভ্রাট তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।
টাকা ফেরত এসেছে। কিন্তু থেকে গিয়েছে সবচেয়ে বড় রহস্যটা—একই নামের দুই মহিলার আধার নম্বর কীভাবে হুবহু এক হল? আর নিজের আঙুলের ছাপ দিয়েও কীভাবে অন্য একজনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা বেরিয়ে গেল? উত্তর মিলবে কি? নাকি এই ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনও গলদ? (রিপোর্টার- সুজাতা মেহেরা)