অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে শহরে, ৯০ টাকার চাকরি! সেই কিশোরই আজ ধনকুবের
প্রতিদিন | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জীবনের চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে! এমন রঙ্গমঞ্চে কত নাট্যই ফুটে ওঠে যা হার মানায় গল্পকথাকে! নাহলে দরিদ্র পরিবারের এক কিশোর, যার কাছে একসময় পাঁচপয়সার আইসক্রিমও ছিল মহার্ঘ, সে হয়ে ওঠে ধনকুবের। হয়ে ওঠে ৩৫ হাজার কোটির সাম্রাজ্যের মালিক। ঠাঁই পায় ফরচুন ইন্ডিয়ার ধনীদের তালিকায়। সত্যিই রূপকথাকে হার মানায় বালাজি ওয়েফার্সের (Balaji Wafers) আশ্চর্য কাহিনি।
যে গল্পের সূচনা গুজরাটের জামনগরের ছোট্ট গ্রাম ধুন্দুরাজিতে। ছোট্ট সেই গ্রামের জনসংখ্যা ছিল মেরেকেটে হাজার দেড়েক। যেখানে মূলত দরিদ্র কৃষকদেরই বাস। গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সেই গ্রামেই বাস করত ভিরানি পরিবার। দিন গুজরান হত কোনওমতে। ভিরানি পরিবারের কাছে সাইকেলও ছিল না। হেঁটে হেঁটেই যে কোনও জায়গায় যেত। গ্রামে প্রায়ই লেগে থাকত খরা। অন্নকষ্ট, অভাব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। পোপটলাল ভিরানির তিন ছেলে ভিখু ভাই, কান্নু ভাই, চান্দু ভাই। আজ তাঁদের সংস্থা পেপসিকোর মতো বহুজাতিক সংস্থাকেও টক্কর দিচ্ছে। অথচ সেই সময় প্রায়ই নষ্ট হত ফসল। পোপটলাল বুঝতে পারতেন না কীভাবে ছেলেদের মুখে অন্ন তুলে দেবেন! শেষে একদিন আর থাকতে না পেরে খরাক্লিষ্ট জমি বেচে দেন ২০ হাজার টাকায়। সেটা গত শতকের সাতের দশক। ওই অর্থের মূল্য তখন বিরাট। সেই শেষ সম্বল চান্দুদের হাতে তুলে দিলেন তিনি। এবার তাঁরা একসঙ্গে পাড়ি দিলেন রাজকোটে। কে জানত ওই বিপুল অর্থও ডুবে যাবে অন্ধকারে। কারণ তিন ভাই মিলে যে ব্যবসা শুরু করলেন তা একেবারেই চলল না। সব টাকাই খোয়া গেল। এবার কী হবে? চান্দু ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি চাকরি করবেন। বাকিরাও একই সিদ্ধান্ত নিলেন। চাকরি জুটেও গেল। শুরু হল লড়াই। চান্দু ভাইয়ের বেতন ৯০ টাকা। বাকি দু’জনের মিলিত রোজগার ১৫০। সাকুল্যে ২৪০ টাকা। এটাই তিনজনের মাস চালানোর পাথেয়। এত অল্প টাকায় তিনজনের গ্রাসাচ্ছেদন মুশকিল। একবার তো ভাড়াবাড়ি ছেড়েই পালাতে হল! ৫০ টাকা ভাড়া বাকি! পকেট যে গড়ের মাঠ। কোনওমতে সেই টাকা পরে শোধ করে দিলেও ভাড়াবাড়িতে আর থাকা হল না। আশ্রয় নিতে হল আধাচেনা মানুষদের বাড়িতে।
কিন্তু এত কষ্টেও পরিশ্রমে কোনও অনীহা ছিল না তিন ভাইয়ের! চান্দুরা সকলেই চাকরি পেয়েছিলেন স্থানীয় এক সিনেমা হলের ক্যান্টিনে। কাজ খাবার পরিবেশন করা। কিন্তু চান্দু কেবল ওই কাজই করতেন না। তিনি অন্ধকার হলে মানুষকে টর্চ জ্বেলে সিট দেখাতেন। সিনেমার পোস্টার লাগাতেন। টিকিট দেখতেন। এর জন্য অতিরিক্ত পয়সা কোনওদিনই চাননি। তবে মালিকপক্ষ দিতেন অতিরিক্ত খাবার। ছেলেগুলির সততা, মনোনিবেশ এসব দেখে দারুণ খুশি মালিক গোবিন্দ খুন্ত। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ”ক্যান্টিন এবার থেকে তোমরাই চালাও। আমি মাসে ১ হাজার টাকা করে দেব।” ভিরানি ভাইরা রাজি হয়ে গেলেন। জীবন বাঁক নিল নয়া মোড়ে। ছবি চলাকালীন বিরতি হলে দ্রুত সকলের অর্ডার করা খাবার দিতে হত। অনেকে দেরি দেখে খাবার নিয়ে অন্ধকার হলে সেঁধিয়ে যেতেন। সিনেমা শুরু হয়ে গিয়েছে যে। চান্দু ঠিক সেই মানুষগুলিকে অন্ধকারেও খুঁজে বের করে পয়সা নিয়ে আসতেন। তবে এর মধ্যেই সমস্যা ছিলই।
সবথেকে বড় ঝামেলা সাপ্লায়ারদের নিয়ে। চান্দু লক্ষ করলেন, ওয়েফারের বিরাট চাহিদা। অর্থাৎ আলুর চিপস। কিন্তু দেখা গেল সেই চিপসের সাপ্লায়াররা প্রায়ই ঝোলাচ্ছেন। মাল দিতে দেরি, অনেক সময় কোয়ালিটিও খারাপ হত। সাপ্লায়ার বদলালেও সমস্যা থেকেই গেল। আর তখন থেকেই তাঁরা পরিকল্পনা করতে লাগলেন, নিজেরাই ওয়েফার তৈরি করার বিষয়ে। ততদিনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। পরিবারের সকলেই বাড়ি বিক্রি করে রাজকোটেই চলে এসেছেন পাকাপাকি। চান্দুর মাথায় আইডিয়া খেলল, নিজেরাই ওয়েফার তৈরি করা যাক। রাজবিরেতে তেলে ভেজে চিপস তৈরি করতে লাগলেন। প্রথম প্রথম সেসব মোটেও খাবার মতো হত না। অনেকগুলোই পুড়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে চান্দু দক্ষ হয়ে উঠলেন চিপস তৈরিতে। ব্যাস! প্যাকেটে ভরে তা বেচা শুরু হয়ে গেল। সেই চিপসের স্বাদ অনেককেই খুশি করল। ততদিনে ভিরানিদের অধীনে তিনটি ক্যান্টিন। অ্যাস্টন হলে দু’টি। আর কোটেচা গার্লস স্কুলে একটা। ব্যবসা অবশ্য ছড়িয়েছে তারও বাইরে। মোটামুটি ১৫-২০টা দোকানে সরবরাহ করা হতে লাগল ওই চিপস। নাম দেওয়া হল বালাজি ওয়েফার্স। যদিও চান্দু হয়তো তখনও আন্দাজ করতে পারেননি শেষপর্যন্ত এই ব্যবসা তাঁদের পৌঁছে দেবে কোন উচ্চতায়!
প্রতিকূলতাও ছিল অনেক। কোনও কোনও দোকানদার দাবি করতেন চিপস বাসি হয়ে গেছে। ফেরত দিয়ে দিতেন। আবার অনেকে টাকা না দিয়েই বলে দিতেন টাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে! কিন্তু ভিরানি ভাইরা এতে ভেঙে পড়েননি। বরং ব্যবসাকে আরও দূর দূর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছিলেন তাঁরা। ধীরে ধীরে রাজকোট জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বালাজি ওয়েফার্স। মাসে রোজগার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার। সেটা ১৯৮৯ সাল। বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে তাঁরা খুলে ফেললেন সেমি-অটোমেটেড প্ল্যান্ট। যদিও সমস্যা ছিলই। প্ল্যান্টের কোনও পার্টস খারাপ হলে ইঞ্জিনিয়াররা বিপুল খরচ করিয়ে দিতেন। চান্দুভাই নিজেই তা সারানোর কাজ শুরু করলেন। দশম শ্রেণিতে পাশের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি হয়ে উঠলেন পার্টটাইম ইঞ্জিনিয়ার। ধীরে ধীরে বালাজি ওয়েফার্স হয়ে দাঁড়াল প্রাইভেট লিমিটেড।
আজ বালাজি ওয়েফার্স দেশের শীর্ষস্থানীয় স্ন্যাক ফুড প্রস্তুতকারক এবং পরিবেশক কোম্পানি। ১৯৭৪ সালে গুজরাটের রাজকোটে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা স্বল্পমূল্যে মানসম্মত স্ন্যাকস সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ চিপস ও নমকিন ব্র্যান্ড! এখন ২০,০০০ টনেরও বেশি স্ন্যাকস উৎপাদন করার ক্ষমতা রয়েছে ওই ওয়েফার্সের। গুজরাট ছাপিয়ে তা উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটকেও ছড়িয়ে পড়েছে। বালাজি ওয়েফার্সের এই আশ্চর্য উত্থান আজও অনুপ্রেরণা জোগায়। বুঝিয়ে দেয়, স্বপ্ন দেখতে জানলে, নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলে সব কিছুই সত্যি হতে পারে!