ক্যানসার কুড়ে কুড়ে খেয়েছে মাকে। মাত্র ১১ বছর বয়সে মাথার উপর থেকে মায়ের ছায়া। রেললাইনের ধারে ছোট্ট টিনের ঘরে বাপ-ছেলের সংসার চলে যেত কোনওরকমে। বাবার অসুস্থতার পরই নেমে এল অন্ধকার! জীবনের কঠিন বাস্তবের সামনে এসে দাঁড়াল মাত্র ১৩ বছরের সঞ্জু।
এক হাতে বই-খাতা, অন্য হাতে চায়ের কেটলি। সংসারের ভার এসে পড়ল তার কাঁধেই। অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ট্রেনে চা বিক্রি করা শুরু করে ফুলিয়ার সঞ্জু দাস। ফুলিয়া স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশে রেলের জায়গায় একটি ছোট টিনের ঘর। সেখানেই বাবাকে নিয়ে সঞ্জুর সংসার। বছর দুয়েক আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার মা। তার পর থেকে বাবাই ছিলেন সঞ্জুর একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে নার্ভের সমস্যায় আক্রান্ত হন তাঁর বাবা। এখন ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না তিনি। আগে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করতেন সঞ্জুর বাবা। অসুস্থতার পর সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের আয়ও বন্ধ। তখন থেকেই সংসার চালানোর দায়িত্ব ক্রমশ এসে পড়ে ছেলের উপর।
সঞ্জুর দিন শুরু হয় ঘরের কাজ দিয়ে। রান্না করা, বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করার পাশাপাশি বাবার দেখাশোনাও করতে হয় তাকে। বাবার মালিশ করা থেকে ওষুধের ব্যবস্থা—সবই সামলাতে হয়। তার সঙ্গে পড়াশোনা। ফুলিয়ার শিক্ষানিকেতন বিদ্যামন্দিরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে সঞ্জু। সংসারের পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিন স্কুলে যেতে পারে না। সপ্তাহে চার দিন স্কুলে যায়। অন্য তিন দিন নিজেই চা তৈরি করে ট্রেনে এবং বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে। সেই টাকাতেই বাবার ওষুধ ও সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা। অভাবের কারণে টিউশনও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবু পড়াশোনা ছাড়েনি সঞ্জু।
তবে সেই লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে মাথার উপর থাকা আশ্রয় নিয়েও। রেলের জায়গায় বসবাস করার কারণে তাঁদের সেখান থেকে সরে যেতে নোটিস দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। বাবার চিকিৎসা, সংসারের খরচ এবং নিজের পড়াশোনা—তিনটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাচ্ছে এক কিশোর। শিক্ষক দিবসে সঞ্জুর জীবনযুদ্ধ তাই সমাজের সামনে এক কঠিন বাস্তবতার ছবি তুলে ধরেছে। যে বয়সে স্কুল, বন্ধু আর খেলাধুলা নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই বাবার মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে রোজগারের পথে নামতে হয়েছে তাকে।