শুভাশিস সৈয়দ
নিখোঁজ ডায়েরির অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নেমেছিল পুলিশ। অগস্টের শেষ দিকে করা ওই অভিযোগের তদন্তের সূত্র ধরে সামনে আসে খুনের ঘটনা। অভিযোগ পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হয় গ্রেপ্তারিও। কিন্তু মৃতের দেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে সেই তদন্তে আলোর দেখা মিলল শুক্রবার। ওই দিন খাল থেকে একটি কাটা পা উদ্ধার করে পুলিশ। সূত্রের খবর, পুলিশ নিশ্চিত যে পায়ের কাটা অংশটি মৃতেরই। বাকি দেহাংশের খোঁজে তল্লাশি চলছে। ঘটনাস্থল মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ। মৃতের নাম সুজিত মণ্ডল (৩৬)। তিনি ওই এলাকার বিজেপি কর্মী হিসেবে পরিচিত।
পুলিশ সূত্রের খবর, ২৮ অগস্ট সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন পেশায় বিড়ি শ্রমিক সুজিত। তাঁর বাড়ি সামশেরগঞ্জ থানার ধুলিয়ান পুরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে। নিখোঁজ হওয়ার আট ঘণ্টা পরে সামশেরগঞ্জ থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করে পরিবার। অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ জানতে পারে, ২৮ অগস্ট সকাল ৭.৩৮ মিনিটে সুজিতকে নিয়ে ধুলিয়ান ডাকবাংলো মোড়ের ভাড়া বাড়িতে ঢোকে এক ব্যক্তি। তার পরের গতিবিধি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়, ওই দিনই কয়েক ঘণ্টা পরে খুন করা হয় সুজিতকে। তদন্তকারী এক পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন, ওই দিন দুপুর দেড়টা নাগাদ মোটরবাইকে করে ঝোলায় ভরে প্রথম বার সুজিতের শরীরের কিছু অংশ ফেলে আসে ওই ব্যক্তি। ফের ওই দিন দুপুর ২.৫৫ মিনিটে বাকি অংশ ফেলে দিয়ে আসা হয়। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সামাউল হক, তাজকিরা বিবি এবং জনি শেখ নামে তিন জনকে গ্রেপ্তার করে। এই সামাউল হককেই সিসিটিভি ফুটেজে সুজিতকে বাইকে বসিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে, তার পরে প্যাকেট নিয়ে বাইকে বেরোতেও দেখা গিয়েছে। তিন ধৃতকে আদালতের নির্দেশে পুলিশ হেফাজতে নেয় পুলিশ। তারপরেই জেরা করে খুনের জট খোলে।
পুলিশ সূত্রের খবর, খুনের পরে নতুন ছক সাজিয়েছিল অপরাধীরা। সুজিতকে অপহরণ করা হয়েছে বলে তাঁর বাড়িতে ফোন করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। পুলিশ সূত্রের খবর, সুজিতকে খুন করে তাঁর মোবাইল থেকে সিম খুলে তাজকিরার মোবাইলে ঢুকিয়ে ফোন করা হয়। পুলিশ সেই ফোন ট্র্যাক করে দুষ্কৃতীদের টাওয়ার লোকেশন পায়। ২৯ অগস্ট গভীর রাতে ডাকবাংলো মোড়ের ভাড়া বাড়ি থেকে সামাউল হক ও তাজকিরা বিবিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জেরা করে জনি শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সামাউলের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে তাজকিরার। জনি শেখ তাজকিরার ছোট জামাই।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, টাকাপয়সা লেনদেনের জেরে এই খুন। পুলিশ জানায়, খুনে মূল অভিযুক্ত সামাউল হক ফরাক্কা এলাকার বাসিন্দা। তার কাপড়ের দোকান রয়েছে। তার আগে বিড়ি কারখানাতে গাড়ি চালাতো সামাউল। সেখানেই সুজিতের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। সেই সুবাদে সুজিতের কাছ থেকে বেশ কয়েক হাজার টাকা ধার নিয়েছিল সামাউল। সেই পাওনা টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে ঝামেলা শুরু হয় এবং তার জেরে খুন। এর মধ্যে গত সাত-আট মাস ধরে সামাউল ও তাজকিরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ধুলিয়ানে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকছিল। পুলিশ জানতে পেরেছে, তাজকিরার ছোট জামাই জনি পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক। সিকিমে কাজ করতো। খুনের জন্য তাকে সিকিম থেকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
শনিবার ধুলিয়ানে সুজিত মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন জঙ্গিপুরের বিজেপি বিধায়ক চিত্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন এবং পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। বিধায়ক বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়ে দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোরতম শাস্তির দাবি জানাব।’ সুজিতের পরিবার খুনের ঘটনায় সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
শুক্রবার পুলিশ বল্লালপুর ফিডার ক্যানালের জল থেকে উদ্ধার করে একটি কাটা পা। সেটি জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। দেহের বাকি অংশের সন্ধানে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও অভিজ্ঞ ডুবুরিরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। শনিবারও চলেছে তল্লাশি অভিযান।