এই সময়: ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মোবাইল ফোনের আসক্তির প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই বিষয়ে সচেতনতার বার্তা দিতে তিনি বেছে নিলেন শনিবার নিউ টাউনে কনভেনশন সেন্টারের শিক্ষক দিবস পালনের মঞ্চকেই। তাঁর মতে, মোবাইলের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা, ঘুম, মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যার মোকাবিলায় প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি। বাক্য সম্পূর্ণ না–করে তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘এর জন্য ভোট কমতে পারে। কিন্তু….!’
‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এখন অনেক পড়ুয়াই অভিভাবকদের নজর এড়িয়ে রাত পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে রাত দেড়টা-দুটোর আগে তারা ঘুমোতে যাচ্ছে না। এর ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না, পরের দিন পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।’
মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুজরাটের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর সংযোজন, ‘সেখানে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া হয় না অথবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।’ এ রাজ্যেও মোবাইল আসক্তির সমস্যা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ছোটদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অবশ্য বিশ্বজুড়েই। ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন-সহ একাধিক দেশে স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ চালু হয়েছে। ব্রিটেনে ২০২৬–এ স্কুলকে কার্যত ‘মোবাইল-ফোন মুক্ত’ করার দিকে আরও কড়া পদক্ষেপ করে বলা হয়েছে— ক্লাসের পাশাপাশি বিরতি, লাঞ্চের সময়ে এবং এক ক্লাস থেকে অন্য পিরিয়ডের মাঝের সময়েও পড়ুয়াদের ফোন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে না। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চালু হয়েছে। চিনে আবার স্কুলে মোবাইল ব্যবহারের পাশাপাশি শিশুদের জন্য বয়সভিত্তিক ‘মাইনর মোড’-এর মাধ্যমে মোবাইল ব্যবহারের সময় ও রাতে তা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। আমেরিকার নিউ ইয়র্কের মেয়র জ়োহরান মামদানি দিন তিনেক আগে ঘোষণা করেছেন, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের এক বছরের জন্য এআই ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে মোবাইল ব্যবহারের সীমা দিনে ৩০ মিনিট এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ৪৫ মিনিট করা হয়েছে।
তবে এই আবহে শিশু–কিশোরদের মধ্যে মোবাইল আসক্তির সমাধান শুধুমাত্র সরকারের হাতে নয় বলে এ দিন ইঙ্গিত দেন শুভেন্দু। তাঁর মতে, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের প্রত্যেক স্তরকে এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তা না হলে শিক্ষক দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্যও ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে।
মোবাইলে আসক্তি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁদের বক্তব্য, করোনাকালের আগে পরিস্থিতি এক রকম ছিল, করোনার পরে তা প্রায় বেলাগাম হয়ে উঠেছে। ২০২০–তে কোভিড পিরিয়ডে স্কুল, কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনার মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে অনলাইন ক্লাস। সেক্ষেত্রে আবশ্যিক হয়ে ওঠে স্মার্টফোন–ট্যাব। পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন তৃণমূল সরকার একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের অনলাইন ক্লাসের সুবিধের জন্য ‘তরুণের স্বপ্ন’ নামে একটি প্রকল্পে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যাতে ওই ছাত্রছাত্রীরা স্মার্টফোন বা ট্যাব কিনতে পারে। কোভিড পর্বের পরেও এই প্রকল্প বন্ধ হয়নি। যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্যর কথায়, ‘করোনার সময়ে উপায় ছিল না। কিন্তু তারপরেও এই মোবাইল কেনার জন্য সরকারি ভাতা দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’ তাঁর মতে, ‘এই প্রকল্প বন্ধ করে নতুন সরকার বরং সেই টাকাটা আরও বেশি স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করার জন্য খরচ করুক।’
অর্থাৎ বার্তা স্পষ্ট— শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি বাদ নয়, কিন্তু শৈশব যেন প্রযুক্তির দখলে চলে না যায়। মানবিক যোগাযোগ, খেলাধুলো, সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তাকেই এখন অগ্রাধিকার দিতে চাইছে বিশ্বের একাধিক দেশ। তাতে কি আগামী দিনে নাম লেখাবে পশ্চিমবঙ্গও? ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সাহেলী গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম শিশুদের মনোযোগ, ধৈর্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে পড়াশোনা, সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগেও। তাই স্ক্রিন-টাইমে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খেলাধুলো, সৃজনশীল কাজ, পারিবারিক কথোপকথন ও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ বাড়িয়ে শিশুদের সক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা জরুরি।’