• ক্যানসার কেড়েছে মাকে, বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ট্রেনে চা বিক্রি ১৩ বছরের সঞ্জুর, এ বার জুড়ল মাথার ছাদের চিন্তাও
    এই সময় | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এক হাতে চায়ের কেটলি, অন্য হাতে বই-খাতা। যে বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলো আর পড়াশোনা নিয়ে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই জীবনযুদ্ধের কঠিন ময়দানে নেমে পড়েছে ১৩ বছরের কিশোর সঞ্জু দাস। একদিকে শয্যাশায়ী বাবার ওষুধ, অন্যদিকে সংসারের খরচ, জীবন সংগ্রামের এই বিপুল ভার মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ছোট্ট কাঁধে তুলে নিয়েছে সঞ্জু। তাই পেট চালাতে নিয়মিত ট্রেনে ট্রেনে চা বিক্রি করতে হচ্ছে ষষ্ঠ শ্রেণির এই ছাত্রকে।

    নদিয়ার ফুলিয়া স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশে রেলের জায়গায় তৈরি একটি ছোট্ট টিনের ঘরে সঞ্জু ও তার বাবার বসবাস। বছর দুয়েক আগে মারণ ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় সঞ্জুর মায়ের। মায়ের ছায়া মাথা থেকে সরার পরে বাবাই সঞ্জুর একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে বছর দেড়েক আগে হঠাৎই নার্ভের মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হন তার বাবা। একসময়ে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে সংসার চালালেও, বর্তমানে তিনি কার্যত শয্যাশায়ী; একা হাঁটাচলা করার ক্ষমতাও হারিয়েছেন।

    বাবার অসুস্থতার পর থেকে পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে ১৩ বছরের এই কিশোরের কাঁধে। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয় সঞ্জুর লড়াই— রান্না করা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন ধোওয়া থেকে শুরু করে অসুস্থ বাবার ওষুধ দেওয়া ও নিয়মিত মালিশ—সব কাজই একা হাতে সামলায় সে।

    সঞ্জু ফুলিয়ার 'শিক্ষানিকেতন বিদ্যামন্দির'-এর ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সপ্তাহে চার দিন স্কুলে যায় সে। আর বাকি তিন দিন নিজেই চা তৈরি করে ট্রেনে ও স্থানীয় বাজারে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে। চা বিক্রির টাকায় কোনো রকমে বাবার ওষুধ ও সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটায়।

    টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার টিউশনিও। তবুও হার মানতে রাজি নয় সঞ্জু। প্রতিকূলতার সঙ্গেই টেক্কা দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে সে।

    লড়াইয়ের মাঝেই সঞ্জুদের জীবনে নেমে এসেছে আরও এক আশঙ্কার কালো মেঘ। রেলের জমিতে বসবাস করার কারণে সম্প্রতি তাদের বাড়ি উচ্ছেদের নোটিশ দিয়ে গিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। মাথার ওপরের সামান্য আশ্রয়টুকুও হারানোর আশঙ্কায় এখন দিন কাটছে বাবা-ছেলের। উচ্ছেদ হলে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে সে কোথায় গিয়ে উঠবে, সেই উত্তর জানা নেই কারও। একদিকে শয্যাশায়ী বাবার চিকিৎসা ও সেবা, অন্যদিকে অনিশ্চিত আশ্রয় আর নিজের পড়াশোনা—সব প্রতিকূলতা সামলে একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ১৩ বছরের এই লড়াকু কিশোর।

  • Link to this news (এই সময়)