বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল
চন্দ্রযান-৩ ও আদিত্য এল-ওয়ান মিশনের সাফল্যর পরে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় আরও এক নতুন ইতিহাস লিখল ইসরো (ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন)। শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে শুক্রবার ভোররাত ২টো ৫৫ মিনিটে সফল ভাবে উৎক্ষেপণ করা হলো সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ ইওএস-০৫। আর এই মহাকাশ অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গোটা দেশের পাশাপাশি বাংলা তথা রানিগঞ্জ কয়লাঞ্চলকে গর্বিত করেছেন ইসরোর বাঙালি বিজ্ঞানী সানি মিত্র।
সম্প্রতি নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভারতে আগামী দিনে যাতে এমন প্রাণহানি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি না-ঘটে, সেই লক্ষ্যেই অত্যন্ত উচ্চপ্রযুক্তির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ সমৃদ্ধ এই কৃত্রিম উপগ্রহটিকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। অন্তত আগামী সাত বছর ধরে মহাকাশ থেকে টানা ২৪ ঘণ্টা এটি দেশবাসীকে পরিষেবা প্রদান করবে। ভারতের প্রায় এক হাজার বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল থেকে শুরু করে গোটা দেশে নজরদারি চালাবে এই ইওএস-০৫। এর মাধ্যমে শুধু যে আবহাওয়ার নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে তা-ই নয়, বরং বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তাও পাওয়া সম্ভব হবে। ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা সহজ হবে। এ ছাড়া দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এবং সার্বিক আবহাওয়ার তথ্য সরবরাহ করে কৃষকদের চাষবাসের কাজেও এটি দারুণ সাহায্য করবে।
রানিগঞ্জের সিএলএম লেনের বাসিন্দা সানি মিত্র গত আট বছর ধরে ইসরোয় বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পিছনে হাতে-গোনা যে কয়েকজন প্রধান কারিগর কাজ করেছেন, সানি তাঁদের অন্যতম। সানির বাবা শঙ্কর মিত্র পেশায় মিনিবাস পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ছেলের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে সানির পরিবার এখন গর্বে আত্মহারা। সানি তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন দুর্গাপুরের সেন্ট জ়েভিয়ার্স স্কুলে, পরে তিনি ভর্তি হন রানিগঞ্জের হেমশীলা স্কুলে। সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা পূর্ণ করে তিনি ভর্তি হন খড়্গপুর আইআইটিতে। পড়াশোনা শেষে ২০১৮-য় তিনি গবেষক হিসেবে ইসরোতে কাজে যোগ দেন। এর আগে চন্দ্রযান-২ মিশনে তাঁর নজরদারির পাশাপাশি চন্দ্রযান-৩ এবং ভারতের প্রথম সৌর অভিযান আদিত্য এল-ওয়ান মিশনেও সানির অনবদ্য ভূমিকা ছিল। এ বার ইওএস-০৫ মিশনের রকেট জিএসএলভি এফ১৭-এ যে পাঁচটি শক্তিশালী ইঞ্জিন রয়েছে তার ডিজ়াইন থেকে শুরু করে মহাকাশযান তৈরির যে দল কাজ করেছে, সেখানে অন্যতম মুখ ছিলেন এই বাঙালি বিজ্ঞানী। এমনকী মহাকাশে উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরে তার সার্বিক মনিটরিংয়ের কাজেও তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
শ্রীহরিকোটা থেকে ফোনে সানি বললেন, 'এই ইওএস-০৫ উপগ্রহের ফলে আমাদের দেশে সাম্প্রতিক নেপালের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোখা সম্ভব হবে। চাষিরাও এর নিখুঁত তথ্য থেকে লাভবান হবেন। টানা নজরদারির কারণে দেশের নিরাপত্তাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।' এই স্যাটেলাইটের বিশেষ প্রযুক্তির কথা তুলে ধরে সানি বলেন, 'ইসরো এই স্যাটেলাইটে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে যাতে স্পেসক্রাফটের নিজস্ব জ্বালানি অনেকটাই বাঁচানো সম্ভব হবে। উৎক্ষেপণের পরে উপগ্রহর সব ব্যবস্থাই একেবারে স্বাভাবিক ভাবে চলছে।' একটি ছোট শহরের ছেলে হয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানের শীর্ষে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি যোগ করেন, 'অবশ্যই এটা গর্বের। এ সব কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, আমি গোটা দেশের জন্যই এমন কাজের কারণে গর্বিত।'