১৮’শ শতকের মাঝামাঝি। দেশে মধ্য গগনে ব্রিটিশ রাজের সূর্য। তার মধ্যে ব্যারাকপুরের বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যান্টনমেন্টে আচমকা মাথা তুলল বিদ্রোহের আগুন। সেখান থেকে প্রায় গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত আন্দোলন। সিপাহি বিদ্রোহকে রাজশক্তি শেষ পর্যন্ত কবজা করতে পারলেও, নড়েচড়ে বসে ব্রিটিশ সরকার। দেশের বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে, প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতেও দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে তারা।
এর পরে দেশে আরও বেশি করে রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়ে যায়। রেলযাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে আসে জলপথের ব্যবহার। এই হারিয়ে যাওয়া জলপথকেই নতুন ভাবে ঢেলে সাজাতে সম্প্রতি নয়া প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। যে নদীপথ এক সময় ট্রেনের কু-ঝিকঝিক শব্দে হারিয়ে গিয়েছিল, তা-ই এ বার বাংলার পর্যটনকে নতুন রূপ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিপাহি বিদ্রোহের আগেই দেশে রেলপথ চালু হয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৩ সালে তৎকালীন বম্বে থেকে থানে প্রথম ট্রেন চলার পরে ১৮৫৪-য় চালু হয় হাওড়া-ব্যান্ডেল রেলযাত্রা। ১৮৫৭-য় সিপাহি বিদ্রোহের পরের বছর শুরু হয় শিয়ালদহ-কুষ্টিয়া রেলপথের কাজ। ১৮৬২ সালে এই পথে রেল চলাচল শুরু হয়। একদিকে হাওড়া-ব্যান্ডেল, অন্যদিকে শিয়ালদহ-কুষ্টিয়া, গঙ্গাকে মাঝখানে রেখে তার দুই পাড় দিয়েই শুরু হয়ে গেল ট্রেন-সফর। আর সেই থেকে গঙ্গাবক্ষে পরিবহণের এক রকম ‘বিদায় ঘণ্টা’ ধ্বণিত হলো। এক সময়ে যে রুটে জলপথই ছিল ভরসা, সেই রুটে কম সময়ে, কম খরচে ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে রেলপথ হয়ে ওঠে এলিট ক্লাস থেকে সাধারণ মানুষ, সবারই প্রথম পছন্দ।
সেই জলপথকেই এ বার পুনরুজ্জীবিত করতে নয়া প্রকল্প নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ সম্প্রতি জানিয়েছেন, শিগগিরই কলকাতার বাবুঘাট থেকে মায়াপুর পর্যন্ত হাইব্রিড ইলেকট্রিক ফেরি চলাচল শুরু হবে। ক্রুজ়ে করে যেতে যেতেই গঙ্গার দু’পাড়ের ধর্মীয় স্থানগুলি দেখে নিতে পারবেন পর্যটকরা। ধর্মীয় মাহাত্ম্যের পাশাপাশি, বাংলার রেনেসাঁ ও স্বাধীনতা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে গঙ্গার দু’দিকের এই সব জায়গার। এক কথায় বলা যায়, এই জলপথ জুড়বে তীর্থ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে।
শঙ্কর ঘোষ জানিয়েছেন, আগামী ১৫ মাসের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এক সময়ে যে পথে বজরায় পাড়ি দিতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেই পথে এ বার যেতে পারবেন আপনিও। সাক্ষী হতে পারবেন নদীর দু’পাড়ে গড়ে ওঠা প্রাচীন নগর-সভ্যতার ঐতিহাসিক ছায়াপথের। রাজ্য সরকার এই প্রকল্পে কোন কোন স্থান দর্শকদের জন্য ঘুরে দেখার ব্যবস্থা করবেন, তা এখনও জানানো হয়নি। তবে বাবুঘাট থেকে মায়াপুর, এই পথের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলি দেখে নেওয়া যাক।
বাবুঘাট থেকে ক্রুজ় ছাড়ার পরে বরাহনগরের কুঠি ঘাট পেরিয়ে প্রথমেই পড়বে বেলুড় মঠ। স্বামী বিবেকানন্দ হুগলি নদীর পশ্চিম পাড়ে ১৮৯৭ সালে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠ ৪০ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত। রামকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র বেলুড় মঠ গোটা দেশের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য তীর্থক্ষেত্র।
বেলুড়মঠ পেরিয়ে ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে পড়বে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। ১৮৫৫ সালের ৩১মে জগন্নাথের স্নানযাত্রার দিন উদ্বোধন করা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের। রানি রাসমণি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, মা কালীর থেকে মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি স্বপ্নাদেশ পান। এই মন্দিরই ছিল রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনক্ষেত্র। এই মন্দিরে রামকৃষ্ণদেব মা কালীকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এখানেই স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়।
খড়দহ ফেরি ঘাটের বাঁ দিকে এক সময় একটি মস্ত দালানবাড়ি ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বাড়িতে দু’দফায় প্রায় ৩৫ দিন কাটিয়ে গিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখানে তিনি বেশ কিছু কবিতাও রচনা করেছিলেন। এই বাড়ি এখন নদীগর্ভে তলিয়ে গেলেও অটুট আছে তার সিংহ দুয়ার। তার পাশেই রয়েছে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর স্মৃতিধন্য শ্যামসুন্দর মন্দির।
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে ব্যারাকপুরে গঙ্গার ধারে অন্নপূর্ণা মন্দির রানি রাসমণির ছোট মেয়ে জগদম্বা প্রতিষ্ঠা করেন বলে কথিত আছে।
অন্নপূর্ণা মন্দিরের উল্টোদিকে শ্রীরামপুরের মাহেশ। ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ও বাংলার প্রাচীনতম রথযাত্রার জন্য প্রসিদ্ধ এই স্থান। ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে মাহেশের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এখানে দেবী ব্রহ্মময়ী রূপে পূজিতা হন। কথিত আছে, সাধক রামপ্রসাদ একবার গঙ্গায় নৌকা চেপে তাঁর বাড়ি হালিশহরে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে গান গাইছিলেন তিনি। দেবী আগে এই মন্দিরে ছিলেন দক্ষিণমুখী। রামপ্রসাদের গান শোনার জন্য বিগ্রহ নাকি পশ্চিমমুখী হয়ে যায়। বামাক্ষ্যাপাও এই মন্দিরে দেবী ব্রহ্মময়ীকে নিজের হাতে পুজো করেছেন।
সাম্প্রতিক কালে ভক্তদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে নৈহাটির বড় মা। শতবর্ষ প্রাচীন এই পুজোর প্রধান আকর্ষণ হলো মা কালীর ২১-২২ ফুট উচ্চতার মৃন্ময়ী মূর্তি। অমাবস্যার রাতে এখানে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়। বড় মায়ের পুজোর ইতিহাস প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, তবে নতুন মন্দির চত্বরের উদ্বোধন হয় ২০২৩ সালে।
রাজা নৃসিংহদেব ১৭৯৯ সালে হংসেশ্বরী কালীমন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ১৮১৪-য় তাঁর বিধবা পত্নী রানি শঙ্করী মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন করেন। দেবীমূর্তি নীলবর্ণা, ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা, খড়্গধারিণী ও নরমুণ্ডধারিণী। মন্দিরের পাশেই টেরাকোটা নির্মিত অনন্ত বাসুদেব মন্দির রয়েছে। দু’টি মন্দিরই ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের দ্বারা সংরক্ষিত।
কল্যাণীর উল্টোদিকে রয়েছে ত্রিবেণী সঙ্গম। প্রয়াগরাজ যেমন যুক্তবেণী, এই স্থান হলো মুক্তবেণী। গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতী এখানে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। তবে যমুনা ও সরস্বতী বহুকাল আগেই শুকিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের চরিত্র নেতা ধোপানি ত্রিবেণী সঙ্গমেই তাঁর ছেলেকে প্রতিদিন আছাড় দিয়ে মেরে, কাজ মিটিয়ে আবার বাঁচিয়ে তুলে বাড়ি ফিরে যেতেন বলে বিশ্বাস। অনেকে ত্রিবেণীকে ‘পূর্বের কুম্ভ’-ও বলে থাকেন। এখানে স্নান করলে সব পাপ মুছে যায় বলে প্রচলিত বিশ্বাস।
১৮০৯ সালে বর্ধমান রাজপরিবারের মহারাজা তেজচন্দ্র বাহাদুর ও তাঁর মা রানি বিষ্ণুকুমারী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। দু’টি বৃত্ত করে মন্দিরগুলি এখানে অবস্থিত। বাইরের বৃত্তে ৭৪টি এবং ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি মন্দির রয়েছে। কালনার ১০৮ শিব মন্দিরকে নব কৈলাস মন্দিরও বলা হয়। এই নব কৈলাসের বাইরে অবস্থিত জলেশ্বর শিব মন্দির। এর উল্টোদিকে শান্তিপুরে রয়েছে অদ্বৈত আচার্যের গোস্বামী পরিবারের হাজার বছরের প্রাচীন শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহ।
এরপর নদীর বাঁ দিকে পড়ছে নবদ্বীপ। শ্রীচৈতন্যদেবের স্মৃতি বিজড়িত নবদ্বীপে বহু প্রাচীন ও বিখ্যাত পোড়া মায়ের (মা কালী) দর্শন পাবেন ভক্তরা। এ ছাড়া রয়েছে সোনার গৌরাঙ্গ মন্দির, দ্বাদশ শিব মন্দির ও ভবতারণ শিব মন্দির।
জলপথে এই সফরের শেষ প্রান্তে রয়েছে মায়াপুর। সেখানে ইসকন মন্দির, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৈদিক গ্রহাণুমন্দির, প্রভুপাদের পুষ্প সমাধি মন্দির, যোগপীঠ ও শ্রীচৈতন্য মঠ-সহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান দেখে এই সফর শেষ হবে। মনে হলে মায়াপুর থেকে কৃষ্ণনগর রাজবাড়িও ঘুরে আসতে পারেন পর্যটকরা।
জলপথে এই সফরের পরিকল্পনা অত্যন্ত পজ়িটিভ উদ্যোগ বলে মনে করছেন ট্র্যাভেল ভ্লগার ও ইউটিউবার শিবাজি পাল। সঠিক ভাবে রূপায়ন হলে এই প্রকল্প বাংলার পর্যটনকে একটা অন্য মাত্রা দেবে বলে তিনি মনে করছেন। শুধু এ রাজ্য নয়, দেশের অন্য রাজ্য, এমনকী বিদেশের পর্যটকরাও এর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন বলে তাঁর বিশ্বাস। এই প্রকল্পকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের ট্রাস্টি কুশল চৌধুরীও। দক্ষিণেশ্বরের পাশাপাশি বাংলার অন্য প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রগুলি নতুন ভাবে মানুষের সামনে উঠে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। ইসকনের জনসংযোগ আধিকারিক রসিক গৌরাঙ্গ দাস জানান, সরকার এ রকম উদ্যোগ নিলে তা অত্যন্ত ভালো। যেহেতু প্রতিদিন হাজার হাজার তীর্থযাত্রী কলকাতা থেকে মায়াপুরে আসেন, নদীপথে ফেরি ব্যবস্থা চালু হলে পর্যটন ক্ষেত্রের আরও প্রসার ঘটবে বলে মনে করছেন তিনি।
বেনারসে মানুষ শুধুমাত্র বিশ্বনাথ দর্শনের উদ্দেশে যায় না। বেনারসের গলি আর গঙ্গার ঘাটের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন ইতিহাসের হাতছানিও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। তেমনই ধর্মীয় মাহাত্ম্যের পাশাপাশি এ রাজ্যে গঙ্গাবক্ষে এই প্রস্তাবিত সফর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক মেলবন্ধন হতে চলেছে বলে আশা করছেন ভ্রমণপ্রেমীরা।