দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া
তিনি শিক্ষক। তবে, শুধু স্কুলেই শিক্ষাদান করেন না। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত দুঃস্থ, অনাথ ও স্কুলছুটদেরও নিজের প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় দিয়ে পাঠদান করেন। আশ্রয় দেন অসহায় বৃদ্ধ, বৃদ্ধাদেরও। তিনি মৃণালসুন্দর পাত্র। পাঁশকুড়ার শ্যামসুন্দরপুর পাটনা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন ‘মৌচাক সেবাশ্রম’। দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে যা দুঃস্থ পড়ুয়া ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কাছে হয়ে উঠেছে ভরসার আশ্রয়।
২০০২-এ গ্রামে নিজের ১০ কাঠা জমির উপরে গড়ে তোলেন সেবাশ্রম। ২০০৫-এ শিক্ষকতার চাকরি পান। মাইনের টাকায় সেবাশ্রমের শ্রীবৃদ্ধির কাজ শুরু করেন। এখন তাঁর কয়েক জন প্রাক্তন ছাত্রও এগিয়ে এসেছেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি সেবাশ্রমের অাবাসিকদের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি চর্চার তালিম দেন মৃণাল। ফুটবল ও ক্রিকেটেও সেবাশ্রমের নাম আছে। সংস্কৃতিচর্চার জন্য স্থায়ী মঞ্চ রয়েছে। সেই মঞ্চে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর একবার মৌচাক সেবাশ্রমে ভাষা দিবস উপলক্ষে সেখানে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেছিল।
প্রতি বছর সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠা দিবসে রক্তদান শিবির হয়। এলাকায় তখন সরকারি জলপ্রকল্প হয়নি। মৃণাল নিজের খরচে সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়ে প্রায় ৩০টি আদিবাসী পরিবারকে পাইপ লাইনে পানীয় জল সরবরাহ করতেন। প্রায় দু’দশক ধরে সেবাশ্রমের অনেক পড়ুয়া প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। সেবাশ্রম এলাকার দুঃস্থ পরিবারের উৎসব-অনুষ্ঠানে নিখরচায় রান্নার সরঞ্জাম দেয়। ২০ বছর ধরে সেবাশ্রমে দুর্গাপুজো হচ্ছে। এলাকার সব সম্প্রদায়ের মানুষজন পুজোর আয়োজন করেন। পাতন্দার বাসিন্দা করিম আলি বলেন, ‘বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। সেবাশ্রমে থেকে পড়াশোনা করেছি। এমএ পাশ করে এখন একটি স্কুলে পার্টটাইম শিক্ষক হিসেবে কাজ করছি।’ মাংলই গ্রামের বিন্দু সিং বলেন, ‘মৌচাক সেবাশ্রম না-থাকলে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারতাম না। এমএ পাশ করে এখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
সেবাশ্রমে এখন ২০ জন দুঃস্থ ছাত্রছাত্রী ও ছ’জন প্রবীণ আছেন। পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়ার সব খরচ বহন করে মৌচাক। মৃণালসুন্দর বলছেন, ‘এখান থেকে বহু ছাত্রছাত্রী বড় হয়েছে। কেউ চাকরি করেছে। কেউ উচ্চশিক্ষিত হয়ে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাভাবে যাতে কারও পড়াশোনা বন্ধ না-হয়ে যায়, সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি।’