• পড়ানো ও স্কুল চালানো বেশ ঝক্কির! ক্লাস শেষে বলল ওরা
    এই সময় | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • সুমন ঘোষ, দাঁতন

    খুদে পড়ুয়াদের অনেকেই শিক্ষক হতে চায়। ৫ সেপ্টেম্বর, শিক্ষক দিবসে সেই সুপ্ত ইচ্ছেটাই প্রকাশ্যে চলে এলো! হোক একদিনের, তবুও শিক্ষক হওয়ার লোভ সামলাতে রাজি নয় কেউ। আবার নিয়ম মেনে স্কুল পরিচালনা শেষে খুদে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকরা সমস্বরে বলল, ‘শোনো, নিয়ম মেনে স্কুল চালানো কিন্তু মুখের কথা নয়। অনেক ঝক্কি সামলাতে হয়!’ তা হলে কি তোমাদের ইচ্ছে বদলে গেল? ওদের কথায়, ‘একদম না। আমরা শিক্ষকই হতে চাই।’

    শনিবার সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশ-জুড়ে পালিত হল শিক্ষক দিবস। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবং পশ্চিম চক্রের আশাপুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের এ দিন স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের। কিন্তু সকলেই শিক্ষক-শিক্ষিকা হতে চাইলে সামলানো কঠিন। আবার কাকে রেখে কাকে বাদ দেওয়া হবে— তা নিয়েও শিক্ষকদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। তাই আগের দিন, শুক্রবার স্কুল কর্তৃপক্ষ সব পড়ুয়াদের জানিয়ে দেন, একদিনের শিক্ষক-শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করতে হলে ছেলেদের অবশ্যই ধুতি- পাঞ্জাবি ও মেয়েদের শাড়ি পরে স্কুলে আসতে হবে।

    স্কুল কর্তৃপক্ষ ভেবেছিলেন, পোশাকের ঝামেলা এড়াতে হয়তো বেশিরভাগ পড়ুয়া ঝুঁকি নেবে না। কিন্তু স্কুল শুরু হতেই দেখা গেল, শিক্ষকদের পরিকল্পনায় জল ঢে‌লে বেশিরভাগ পড়ুয়াই শাড়ি ও ধুতি- পাঞ্জাবি পরে স্কুলে এসেছে। যা দেখে বিস্মিত হন শিক্ষকরাও। তারপরে সব সামলে খুদে পড়ুয়ারা শাড়ি আর ধুতি- পাঞ্জাবি পরেই হাজিরা খাতা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মতোই চলল ক্লাস নিতে।

    এ দিন পঞ্চম শ্রেণির অন্বেষা সাঁতরাকে প্রধান শিক্ষিকা ও শুভশ্রী বেরাকে সহকারী প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দীপান্বিতা সাঁতরা, সৌম্যদীপ রায়, পলাশ সাঁতরা, রণজিৎ ঘোড়াই, বলরাম হাজরা, প্রিয়াঙ্কা সিংহ, রিতা ঘোড়াই, রাখি মাজি, মধুশ্রী দাসরা প্রার্থনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি মিড-ডে মিল তদারকির দায়িত্বও পালন করে।

    তৃতীয় শ্রেণির অঙ্ক ক্লাস নিতে গিয়ে দীপান্বিতা বোর্ড-ওয়ার্ক করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির পরিবেশ বিজ্ঞানের ক্লাস নিতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা শিখিয়েছে কী ভাবে চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। শিশু শ্রেণিতে বাংলা পড়াতে গিয়ে অবশ্য বেগ পেতে হয় সৌম্যদীপকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সে কিঞ্চিৎ শাসনও করেছে পড়ুয়াদের। দিনের শেষে ‘ফিডব্যাক’ পর্বে সৌম্যদীপের শাসন, শুভশ্রীর গণিত ও অন্বেষার ইংরেজি ক্লাসের দক্ষতায় শিক্ষকরা আপ্লুত।

    একদিনের প্রধান শিক্ষিকা অন্বেষার কথায়, ‘খুব ভালো লেগেছে। বড় হয়ে আমি শিক্ষক হতে চাই।’ সহকারি প্রধান শিক্ষিকা শুভশ্রী বেরা বলে, ‘ নিয়ম মেনে স্কুল পরিচালনা যে কতটা ঝক্কির তা একদিনেই টের পেয়েছি। তারপরেও আমি কিন্তু শিক্ষকই হতে চাই।’ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনুপম বেরা, সহকারী শিক্ষক কমল খাটুয়া, অরিজিৎ দাস অধিকারীরা বলছেন, ‘বছরে এই একটি দিনে পড়ুয়ারাই স্কুল পরিচালনা করে। হাতে-কলমে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ওদের সারা জীবন থেকে যায়।’ এই উদ্যোগে খুশি অভিভাবকরাও। ফলে তাঁরাও রীতিমতো উৎসাহ নিয়েই শিক্ষক-শিক্ষিকার বেশে সাজিয়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়েছিলেন।

  • Link to this news (এই সময়)