একজন মা কী চান? সন্তানের হাসিমুখ। ব্যস, এটুকুই। এই হাসিটুকুর জন্য সাত সাগর তেরো নদী পেরোতে পারেন তিনি। নেমে পড়তে পারেন যে কোনও যুদ্ধে। এই জন্যই বোধহয় অটিজম আক্রান্ত ছেলের জন্য আস্ত স্কুল খুলে ফেলতেও দু’বার ভাবেননি রত্নাবলী রায় সেনগুপ্ত।
রত্নাবলী শিক্ষিকা। ত্রিপুরার আগরতলা উইমেন্স কলেজের অধ্যাপক। তাঁর ছেলে অটিজমে আক্রান্ত। তার পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না রত্নাবলীর। কলকাতার একটি স্পেশাল স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না।
ত্রিপুরা থেকে প্রতিদিন কলকাতায় উজিয়ে গিয়ে পড়াশোনা চালানো যে সম্ভব নয় বুঝতে সময় লাগেনি তাঁর। এখন উপায়? ছেলের পড়াশোনা তো আর থামিয়ে দেওয়া যায় না। আবার কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে চলে আসাও সহজ নয়। এক দিকে সন্তানের ভবিষ্যৎ, অন্য দিকে নিজের শহর, নিজের সংসার—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রত্নাবলী তখন যেন একটি পথ খুঁজছিলেন।
সেই সময়ে স্কুল থেকে তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয়, ‘আপনি বরং আগরতলায় এরকম একটা স্কুল তৈরি করুন। ওখানে আপনার ছেলের মতো আরও অনেক শিশু রয়েছে।’ এই ছোট্ট পরামর্শই বদলে দেয় রত্নাবলীকে।
সেটা ২০০৪ সাল। কয়েক জন পরিচিত, শুভানুধ্যায়ী আর অভিভাবকদের নিয়ে জোট বাঁধালেন রত্নাবলী। তৈরি হলো ‘বিদ্যা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। ২২ বছর পরে সেটাই এখন মহিরূহ। স্কুলে বর্তমানে ২৫ জন শিশু পড়াশোনা করে। কেউ অটিস্টিক, কেউ ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত, কারও অন্য কোনও বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিদ্যা তাদের কাছে শুধু একটা স্কুল নয়, বরং আশ্রয়। রত্নাবলীয় নিছক শিক্ষিকা নন, তিনি স্কুলের বিনা পয়সার প্রধান শিক্ষিকা।
‘বিদ্যা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ তৈরির আগে কলকাতার বেশ কয়েকটি স্পেশাল স্কুল ঘুরে দেখেছিলেন রত্নাবলী। সেখানকার কাজের পদ্ধতি বুঝেছেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। যেগুলো সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে, সেগুলিই নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগিয়েছেন। নিজের ছেলেকে বড় করার অভিজ্ঞতাও তাঁকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। প্রত্যেক শিশুর শেখার ধরন আলাদা, পৃথিবীকে দেখার ভাষাও ভিন্ন। সেই আলাদা হওয়ার জায়গাটুকুকেই সম্মান করে এগোনোর চেষ্টা করে রত্নাবলীর স্কুল।
শুধু বই খুলে পড়ানো নয়, বিদ্যায় শিশুদের কমিউনিকেশন স্কিল, সামাজিকতা, আবেগ, আচরণ এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা বাড়ানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়। দেওয়া হয় বিশেষ শিক্ষা, থেরাপি এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট ট্রেনিং। আবার চঞ্চল শিশুদের শেখানোর ধরন আলাদা। রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার নির্দেশিকা মেনেই চলে সব কিছু।
কিন্তু এতটা পথ পেরিয়েও রত্নাবলীর লড়াই শেষ হয়নি। ‘বিদ্যা’ চলে মূলত অভিভাবকদের দেওয়া অর্থে। কিন্তু তাঁদের অনেকেই নিম্নবিত্ত। সকলের পক্ষে পুরো ফি দেওয়া সম্ভব হয় না। অথচ একটি স্পেশাল স্কুল চালাতে খরচ কম নয়। শিক্ষা, থেরাপি, প্রশিক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অর্থ। আরও একটা জিনিস দরকার, সেটা হলো বাড়ি। শুধু কয়েকটি ঘর হলেই তো চলবে না। দরকার শ্রেণিকক্ষ, থেরাপির জায়গা, খেলাধুলার মাঠ, শিশুদের স্বাধীন ভাবে নড়াচড়া করার মতো জায়গা।
এক সময়ে ভাড়া বাড়িতে চলত ‘বিদ্যা’। কিন্তু প্রতিবেশীদের আপত্তির কারণে সেই বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়। কখনও কোনও শিশু হঠাৎ শব্দ করে ওঠে। কখনও অস্থির হয়ে পড়ে। কখনও একটু বেশি চঞ্চল হয়। এই স্বাভাবিক আচরণই হয়ে ওঠে আপত্তির কারণ। তার পর থেকে একটা বাড়ি খুঁজছেন রত্নাবলী। একটা আবাসিক স্কুল তৈরির স্বপ্ন দেখেন তিনি। এমন একটি জায়গা, যেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা নিরাপদে থাকবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে না। এখন কোমর বেঁধে সেই লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি। রত্নাবলী মা, এই লড়াইটাও তিনি নিশ্চিত জিতবেন।