নয়াদিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় পাঁচতলা মেসবাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনায় জরাজীর্ণ বাড়ির দুর্বল কাঠামোই প্রধান কারণ নয়, সামনে আসছে একের পর এক নিয়মভঙ্গের অভিযোগ। অন্তত ৫০ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ বাড়িকে কী ভাবে ছাত্রদের থাকার পেইং গেস্ট (PG) অ্যাকোমোডেশন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। পাশাপাশি, অনুমোদন ছাড়া কী ভাবে সেখানে অতিরিক্ত তলা তৈরি করা হলো এবং নির্মাণকাজ চলাকালীন কেন সেখানে ছাত্রদের রাখা হলো— দুর্ঘটনার পরে এই প্রশ্নগুলিই এখন বড় হয়ে উঠেছে। রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ ভেঙে পড়ে ওই বাড়ি। ঘটনায় ইতিমধ্যেই ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে এখনও অনেকে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা।
দিল্লির চাণক্যপুরীর কাছে মোতিবাগ এলাকায় সত্য নিকেতনের ওই বাড়িটি ‘Hostel Daze’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরেই জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল। কয়েকমাস আগেই সেখানে PG হিসেবে ভাড়া দেওয়া শুরু হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় ছাত্রদের থাকার জায়গা হিসেবে এই এলাকার চাহিদা বেশি। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়িটিকে PG-তে পরিণত করেন বাড়ি মালিক। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বাড়ির মালিক হরিরাম বনসল। তিনি গত কয়েক মাস ধরে বাড়িটির সংস্কার ও পরিবর্তনের কাজ করাচ্ছিলেন। চলতি বছরের অগস্টেই সেখানে ছাত্রদের থাকতে দেওয়া হয়। অথচ তখনও নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। এমনকী বাড়ি ভেঙে পড়ার সময়েও বেসমেন্টে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ।
MCD-র প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, যে এলাকায় বাড়িটি ছিল সেখানে সর্বোচ্চ গ্রাউন্ড প্লাস এক তলা নির্মাণের অনুমতি ছিল। অথচ ভেঙে পড়া বাড়িটি ছিল গ্রাউন্ড প্লাস চার তলা। অর্থাৎ অনুমোদিত নির্মাণসীমার বাইরে একাধিক অতিরিক্ত তলা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ। MCD ইতিমধ্যেই বাড়িটিকে নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসমেন্টে নির্মাণ বা সংস্কারের কাজের অভিযোগ। দুর্ঘটনার সময়ে সেখানে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, বেসমেন্টে জল জমে থাকা সত্ত্বেও কাজ চলছিল। গত কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে এলাকায় জল জমেছিল এবং বাড়িটির বেসমেন্টেও জল ঢুকেছিল বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, বেসমেন্টে কোনও অনুমোদনহীন খনন বা কাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না। সেই কাজই বাড়িটির দুর্বল কাঠামোর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
বাড়িটি মূলত বসবাসের জন্য তৈরি হলেও সেটিকে ছাত্রদের PG বা হস্টেলে পরিণত করা হয়েছিল। কমবেশি ৩০টি ঘর ছিল। ঘরপিছু দুই থেকে তিন জন ছাত্রকে রাখার পরিকল্পনা ছিল। গোটা বাড়িতে ৭৫টি খাটও রাখা ছিল ছাত্রদের জন্য। এরকম জরাজীর্ণ কাঠামোর বাড়িতে এত বেশি মানুষের বসবাস আরও বিপদ বাড়িয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সত্য নিকেতন এলাকায় বহু বাড়িই এ ভাবে PG বা হস্টেল হিসেবে ভাড়া দেওয়ার ট্রেন্ড রয়েছে। মালিকরা অন্যত্র থাকেন, ভাড়া অনলাইনে নেন এবং নিয়মিত বাড়ির সংস্কার করেন না বলে অভিযোগ।
এখানেই সামনে আসছে প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন। একটি প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো, জরাজীর্ণ বাড়িতে এরকম নিয়ম ভেঙে একাধিক তলা, নতুন করে নির্মাণকাজ এবং ছাত্রদের বসবাসের ব্যবস্থা— সবই যদি একসঙ্গে চলছিল, তা হলে সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি এল না কেন? MCD-র এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বাড়ির বিরুদ্ধে পূর্বে কোনও অভিযোগের রেকর্ড ছিল না। কিন্তু এখন তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, নির্মাণ বা সংস্কারের অনুমতি আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না।
দিল্লির মেসবাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনায় তার মালিক হরিরাম ও আরও কয়েজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে সাউথ ক্যাম্পাস থানায়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুন, বাড়ি মেরামতিতে গাফলতি এবং বাড়ির আবাসিকদের জীবন বিপজ্জনক করে তোলার ধারায় মামলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পরে দিল্লি প্রশাসন ও MCD বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। চার তলার বেশি বেআইনি নির্মাণ দ্রুত সিল করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে এবং দায়িত্বে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শুধু দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাড়িই নয়, পাশের একটি PG-রও অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। জরাজীর্ণ ওই বাড়িটিকেও খালি করে সিল করে দিয়েছে প্রশাসন। সেই বাড়িটিও ফেলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, দিল্লি পুরসভা কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে মেসবাড়ি খালি করে দেওয়ার নোটিস দিয়েছে এবং একই সঙ্গে তিন দিনের মধ্যে পুরো বাড়ি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। বাড়ির মালিক নিজে ভেঙে না ফেললে, পুরসভা কর্তৃপক্ষ তা ভেঙে দেবেন।
দিল্লির মেসবাড়ি ধসে পড়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসল সেখানকার প্রশাসন। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সোমবার সকালে জানিয়েছেন, জনসাধারণের ব্যবহার্য সব বাড়ির প্রতি বছর স্ট্রাকচারাল অডিট (নির্মাণ কাঠামো ঠিক রয়েছে কি না, তার পরীক্ষা) করার ব্যাপারে নিয়ম-নীতি তৈরি হচ্ছে। দিল্লির সরকার ও দিল্লি পুরসভা ওই নীতি তৈরি করছে। পিজি অ্য়াকোমেডেশন, নার্সিংহোম, স্কুল, হাসপাতাল-সহ সব পাবলিক বিল্ডিংয়ের কাঠামো প্রতি বছর পরীক্ষা করাতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা করানো না হলে সেগুলিতে কোনও কাজ করতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যাঁরা ভেঙে পড়া মেসবাড়ি খালি করে বেরিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করছে প্রশাসন।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— নিয়ম ভাঙার পরে ব্যবস্থা নেওয়া নয়, নিয়ম ভাঙার আগেই নজরদারি কোথায় ছিল? রবিবারের দুর্ঘটনার পরে নতুন করে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে তৎপর প্রশাসন।