সুমন ঘোষ
মুচমুচে এই মিষ্টির স্বাদ পেতে এখনও মুখিয়ে থাকেন মানুষ। যদিও কৌলীন্য হারিয়েছে অনেক আগেই। তবু বাবরসার কদর এতটুকুও কমেনি। সঙ্গে রয়েছে বড়মার আশীর্বাদ। তাতে গত কয়েক বছরে বিক্রিও বেড়েছে বাবরসা-র। ফলে আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে ক্ষীরপাইয়ের মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। সঙ্কট শুধু একটাই। কারিগরের অভাব। কারণ, ধৈর্যের সঙ্গে এঁটে উঠতে না পারায় নতুন করে আর কারিগর তৈরি হচ্ছে না!
ক্ষীরপাইয়ের বাবরসা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, এই মিষ্টির বয়স প্রায় ২৫০ বছর। ইংরেজ কুঠি সাহেব এডওয়ার্ড বাবরশ ক্ষীরপাইয়ে বর্গী হানা রুখে দিয়েছিলেন। তাঁর নামেই এই মিষ্টির নামকরণ। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এই মিষ্টির জন্ম নাকি আরও আগে। দিল্লির সম্রাট বাবর শাহের সময়ে। তিনি এই মিষ্টির সুখ্যাতি করায় তাঁর নামেই নামকরণ।
তবে বাবরসা-র কৌলীন্যের কারণ অন্য। এক সময়ে বাবরসা ভাজা হতো ঘি দিয়ে। ঘি-ময়দা-জলের মিশ্রণ প্রথমে ছান্তায় ফেলা হতো। তার পরে ছান্তা নাড়িয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলা হতো কড়াইয়ে থাকা তপ্ত ঘিয়ের উপর। মুচমুচে হলেও মিষ্টি ছাড়া কি খাওয়া যায়! তাই পরিবেশনের সময়ে সেই গোলাকার মিষ্টির উপরে ছড়িয়ে দেওয়া হতো মধু। এখন যদিও তা আর হয় না। এখন সাদা তেলেই ভাজা হয় বাবরসা। আর পরিবেশনের সময় উপরে ছড়ানো হয় চিনির রস।
ক্ষীরপাইয়ের হালদারদিঘির মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী সুশান্ত দে বলেন, ‘ঘি, মধু দিয়ে বাবরসা তৈরি করতে গেলে এক একটি মিষ্টির দাম ৬০-৭০ টাকা পড়বে। কে এত টাকা দাম দিয়ে কিনে খাবে? তাই সব ভুলে এই কৌশল নিয়েছি আমরা। প্রতি পিস ১০ টাকাতেই বিক্রি করি।’ ব্যবসায়ীরা জানান, এখন কলকাতা থেকেও বাবরসা-র অর্ডার আসে। তখন প্রতি পিস ২০ টাকায় বিক্রি হয়।
যদিও বাবরসা-র বাজার কলকাতার উপরে দাঁড়িয়ে নেই। যেহেতু ক্ষীরপাইয়ের উপর দিয়ে দুই মেদিনীপুর, হাওড়া, কলকাতা, হুগলি, বাঁকুড়া, বর্ধমানের বাস যাতায়াত করে, তাই অনেক বাসযাত্রীই এই মিষ্টি কিনে খান। তার সঙ্গে কয়েক বছর ধরে যুক্ত হয়েছে ক্ষীরপাইয়ের ‘বড়মা’র আশীর্বাদ। মিষ্টি ব্যবসায়ী সুশান্তের কথায়, ‘বড়মার জন্য এক-একদিন ৩০০ পিস পর্যন্ত বাবরসা বিক্রি হয় শুধু আমার দোকান থেকেই। দর্শনার্থীরা পুজো দেওয়ার জন্য, বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যও কেনেন।’
ক্ষীরপাই পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল মহকুমার ছোট্ট একটি শহর। এই শহরেই ছোটবড় প্রায় ৪০টি মিষ্টির দোকান রয়েছে। সে সব দোকানে কর্মীর সংখ্যাও শতাধিক। এই বিষয়টি নজরে রেখে বাবরসা-র জিআই ট্যাগ পাওয়া নিয়েও ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল। মিষ্টি ব্যবসায়ী শঙ্কর বৈরাগী বলেন, ‘একবার প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে আমরা কলকাতায় গিয়েছিলাম। জিআই ট্যাগ পাওয়ার জন্য আরও কিছু তথ্য আমাদের দিতে বলা হয়েছে। তারপর দেখা যাক, যদি জিআই ট্যাগ পাওয়া যায়।’
তবে বড় সঙ্কট হলো কারিগরের। ব্যবসায়ারী জানাচ্ছেন, এই মিষ্টি তৈরি করতে ভীষণ ধৈর্য্যের প্রয়োজন। একজন কারিগর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করলে বড়জোর দেড়শো পিস বাবরসা তৈরি করতে পারেন। প্রতি পিস মিষ্টি তৈরির জন্য কারিগরকে ৩ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে চা, পান ও টিফিন। আবার এত পরিশ্রমের জন্য নতুন প্রজন্ম বাবরসা তৈরির কাজে উৎসাহ হারাচ্ছে। ফলে বাবরসা-র ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা বাড়ছে। মিষ্টি ব্যবসায়ী অরূপ শাসমলের আক্ষেপ, ‘আমাদের ২টি কাউন্টার থেকে প্রতিদিনই গড়ে ৩০০টিরও বেশি বাবরসা বিক্রি হয়। কিন্তু বেশি যে বানাবো, সে উপায় নেই। কারণ, কারিগরের সঙ্কট।’ এই মিষ্টি তিন দিন সহজেই রাখা যায়। নষ্ট হয় না। ফলে প্রথম দিন বেশি বিক্রি না হলে, পর দিন আর নতুন করে মিষ্টি বানান না ব্যবসায়ীরা।
কিন্তু ‘বড়মা’র রিল যদি ভাইরাল না হতো সামাজিক মাধ্যমে, প্রতিদিন যদি কাতারে কাতারে দর্শনার্থী না আসতেন, তা হলে বাবরসার ভবিষ্যৎ কী হতো, তা নিয়ে আজকাল প্রায়ই আলোচনা হয় মিষ্টি ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কথায় কথায় এক ব্যবসায়ী বলছেন, ‘সবই বড়মা-র কৃপা।’