• বাংলার দুয়ারেও বিপদ, সিকিমে নদীতে ধস, তিস্তাপাড়ে সতর্কতা
    এই সময় | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: শুধু দুর্যোগ তো নয়, মারাত্মক বিপর্যয়। হিমবাহ ধসে তার চাঁই নদীতে পড়া ও তার ফলে ভোটকোশি নদীতে ভয়াবহ হড়পা বান এবং ১৩০০–র উপর প্রাণহানি, নিখোঁজ হাজার পাঁচেক। প্রতিবেশী দেশ নেপালের ওই ঘটনার পরে স্বস্তিতে নেই ভারতও। পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে রাজ্যের উত্তর প্রান্তে দুশ্চিন্তা বেশি। এবং সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে এ রাজ্যের দুয়ারে হাজির হলো প্রায় একই গোত্রের প্রাকৃতিক বিপদ। যা ঘটল নেপালের রাসুয়ায় ২৬ অগস্টের বিপর্যয়ের ১০ দিনের মাথায়।

    শনিবার গভীর রাতে বাংলার প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমের উত্তর দিকের মাঙ্গান জেলায় নাকা ফরেস্ট এলাকার থেং টানেলের উল্টো দিকে চিয়াকুং নদীর উপরিভাগে বিশাল ধস নামে। পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। তার ফলে চিয়াকুংয়ের পাশাপাশি তিস্তা নদীর জলপ্রবাহও আংশিক অবরুদ্ধ হয়েছে। উত্তর সিকিমের চুংথাং এলাকায় বাড়তে শুরু করেছে তিস্তার জলস্তর। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির খবর কিছু সামনে না–এলেও ওই ঘটনায় সিকিম তো বটেই, আতঙ্ক ছড়িয়েছে কালিম্পং, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার কয়েকটি এলাকায়।

    রবিবার দুপুর থেকে কালিম্পংয়ের তিস্তা বাজার ও দার্জিলিংয়ের সেবক এলাকায় মাইকে প্রচার করে তিস্তার পাড় ঘেঁষে বসবাস করা মানুষদের সরে যেতে বলা হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমার তিস্তা লাগোয়া বাগরাকোট গ্রাম পঞ্চায়েতের টোটগাঁও, ওদলাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের গজলডোবা ও রাজগঞ্জ, ক্রান্তি ব্লকের চাঁপাডাঙা, চেংমারি–সহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষকে নদীর পাশ থেকে দূরে সরে যেতে বলা হয়েছে। মালবাজার মহকুমা প্রশাসনের উদ্যোগে ইতিমধ্যেই টোটগাঁও গ্রামের তিস্তা তীরবর্তী মানুষদের সরিয়ে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়েছে নদী থেকে দু’কিলোমিটার দূরে।

    মালবাজারের মহকুমাশাসক উৎকর্ষ খান্ডাল জানান, পরিস্থিতির উপর সতর্ক নজর রেখে সেই মতো কাজ করা হচ্ছে। জলপাইগুড়ি শহর লাগোয়া বালাপাড়া, বিবেকানন্দ পল্লি, সারদা পল্লি, সুকান্তনগর কলোনির মতো তিস্তার পাড়ে থাকা তল্লাটগুলির বাসিন্দাদের জলপাইগুড়ি সদর ব্লক প্রশাসনের তরফে মাইকে টানা প্রচার করে সতর্ক করা হচ্ছে। তিস্তার জল বাড়লে ওই সব এলাকার মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে রাখতে বিভিন্ন স্কুলগুলোকে তৈরি রাখা হয়েছে বলে জলপাইগুড়ি সদরের বিডিও বিপ্লবকুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন।

    দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্ত জানিয়েছেন, রবিবার সকালে তিনি এই ব্যাপারে সিকিমের মুখ্যসচিব রবীন্দ্র তেলাংয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাজুর বক্তব্য, সিকিমের মুখ্যসচিব তাঁকে জানিয়েছেন যে, শনিবার রাতে চিয়াকুং নদীর উপরিভাগে ধস নামে এবং তার জেরে তিস্তার প্রবাহ সাময়িক ভাবে আটকে গেলেও পরে তা স্বাভাবিক হয়। দার্জিলিংয়ের সাংসদকে সিকিমের মুখ্যসচিব জানান, চিয়াকুং ও তিস্তা দু’টি নদীতেই কিছুটা জল জমে থাকলেও দু’টি নদীতে জল বইছে অর্থাৎ তাদের প্রবাহ থামেনি। দার্জিলিংয়ের সাংসদের বক্তব্য, ‘আতঙ্কের পরিস্থিতি এখনও পর্যন্ত তৈরি হয়নি। তবে সতর্ক থাকা দরকার।’

    শনিবার গভীর রাতের ঘটনায় চিয়াকুং নদীর ওই জায়গায় একটি হ্রদ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেটা হলে ২০২৩–এর অক্টোবরের মতো বিপর্যয় ঘটতে পারে অনেকে আশঙ্কা করছেন। চিয়াকুং ও তিস্তা, দু’টিই হিমবাহ পুষ্ট নদী। তিস্তায় এসে মিলিত হয়েছে সিকিমের অজস্র নদী ও ঝোরা। তাই, তিস্তার জলপ্রবাহ কোথাও বাধা পেলে হড়পা বানের আশঙ্কা থাকে। শনিবার রাতের ঘটনাস্থলের কাছেই ডিকচু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সেখানকার জলাধারের জল ছাড়া হচ্ছে।

    ২০২৩–এর অক্টোবরে সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে তিস্তায় বিধ্বংসী হড়পা বানের স্মৃতি এখনও বহু মানুষের স্মৃতি থেকে মোছেনি। সাউথ লোনাক হ্রদ হিমবাহ–সৃষ্ট হ্রদ। ওই হ্রদের বাঁধ ভেঙে তিস্তার অববাহিকা দিয়ে জলের প্রবল স্রোত বয়ে গিয়েছিল (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড)। যার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণের। প্রভাব ছড়িয়েছিল কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ পর্যন্ত। স্বভাবতই সিকিমের চিয়াকুং নদীতে ধস নামা এবং তিস্তার প্রবাহ আটকে যাওয়ার খবর রবিবার সামনে আসতেই আতঙ্ক ছড়ায়। তিস্তার জল আচমকা বেড়ে গিয়ে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে, এমন জল্পনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে সময় লাগেনি।

    তথ্য: সঞ্জয় চক্রবর্তী, সব্যসাচী ঘোষ ও কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

  • Link to this news (এই সময়)