নদিয়ায় গরুর দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক! ‘ভুল না শুধরালে’ বড় বিপদ, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
প্রতিদিন | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাস্তায় পড়ে থাকা প্লাস্টিক থেকে গবাদি পশুর খাবার, সেখান থেকেই দুধে মিশছে ক্ষতিকর কণা! মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ। জল, খাবার থেকে শুরু করে দুধ—বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধুমাত্র পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক চিন্ময় রায় বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ধীরে ধীরে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সেই প্লাস্টিকের টুকরো অনেক সময় গবাদি পশুর খাবারের সঙ্গে তাদের শরীরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সেই প্লাস্টিকজাত ক্ষুদ্র কণা গরুর শরীরে প্রবেশ করে দুধের মাধ্যমেও মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে।
শুধু দুধ নয়, বর্তমানে প্লাস্টিকের ব্যবহার যে হারে বেড়েছে, তাতে প্যাকেটজাত খাবার, পানীয়, জল এবং বিভিন্ন প্লাস্টিকের মোড়কে থাকা খাদ্যপণ্যের মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দুধের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিকজাত প্যাকেজিং থেকেও খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের রক্তসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র কণাগুলি মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে মানবস্বাস্থ্যের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে এখনও আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগের। জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন পরিবেশগত উৎসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে প্যাকেটজাত দুধ, প্লাস্টিকের বোতল এবং দুধ খাওয়ানোর অন্যান্য প্লাস্টিকজাত সামগ্রীর ব্যবহারও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কোনও একটি খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ থেকে খাদ্যশৃঙ্খল হয়ে মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পৌঁছনোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এর উৎস চিহ্নিত করা এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্লাস্টিক দূষণ কমানো অত্যন্ত জরুরি।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে হলে প্রথমেই প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। রাস্তাঘাট, জলাশয় ও কৃষিজমিতে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে। খাদ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রেও নিরাপদ বিকল্প উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে দুধ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পরীক্ষা, তার উৎস চিহ্নিতকরণ এবং কীভাবে তা খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে তা নিয়ে গবেষণা আরও জোরদার করা দরকার। মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মানবদেহে এর সঞ্চয় এবং কোন মাত্রায় তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। মানুষের সুস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে।