আজকাল ওয়েবডেস্ক: একদিকে আইএসএলের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে তারুণ্যের তেজ। একদিকে সাহাল, মনবীর, শুভাশিস, কিয়ান নাসিরি, রাহুল ভেকে, মেহতাব সিং, সুহেল ভাটের মতো আইএসএল খেলা ফুটবলারদের নিয়ে সাজানো বাগান।
অন্যদিকে কোনও সিনিয়র ফুটবলার ছাড়াই তরুণ তুর্কিদের ভরসায় নেমেছিল ইস্টবেঙ্গল। কলকাতা লিগের ডার্বিতে তাই লড়াইটা ছিল অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্যের। কিন্তু দিনের শেষে বারাসতে আইএসএলের তারকাখচিত মোহনবাগানকে রুখে দিয়ে নিজেদের জেদ ও লড়াইয়ের মানসিকতার পরিচয় দিল ইস্টবেঙ্গলের তরুণ ব্রিগেড। ভাগ্য সহায় থাকলে ইস্টবেঙ্গল জিততেও পারত।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ছিল মোহনবাগানের হাতে। সেটাই স্বাভাবিক। ইস্টবেঙ্গল প্রথমার্ধে খুব বেশি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেনি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আগে নিজেদের রক্ষণ সামলে রাখা, কোনওভাবেই গোল না খাওয়া। সেই সুযোগে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে একের পর এক আক্রমণ তৈরি করার চেষ্টা করছিল সবুজ-মেরুন।
Advertisement
প্রথমার্ধে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে বলার মতো আক্রমণ বলতে বিজয় মুর্মুর একটি ফ্রি-কিক। তার বাইরে আক্রমণে সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি লাল-হলুদ। বিপরীতে মোহনবাগান পজেশন ধরে রেখে ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছিল।
হাইড্রেশন বিরতির পরেই অবশ্য বদলে গেল ম্যাচের ছবি। গোল পেল মোহনবাগান। তবে সেই গোলের পিছনে ইস্টবেঙ্গলের অঙ্কন ও গোলকিপার গৌরবের ভুলের অবদানও ছিল যথেষ্ট।
আপুইয়ার লম্বা বল ধরে মনবীর সিং যখন এগিয়ে গেলেন, তখন তাঁর সামনে ছিলেন অঙ্কন ভট্টাচার্য এবং পিছনে জয়বাজ। মনবীরকে শট নেওয়ার মতো জায়গা দিয়ে ফেলেন অঙ্কন। অন্যদিকে লাল-হলুদ গোলকিপার গৌরব সাউ নিজের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মনবীর গড়ানো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। এগিয়ে যায় মোহনবাগান।
কিন্তু ডার্বির গল্প তখনও বাকি। গোল খাওয়ার পর যেন ঘুম ভাঙল ইস্টবেঙ্গলের। দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে দেখা গেল লাল-হলুদকে। আক্রমণে গতি বাড়ল, পাসিংয়ে এল আত্মবিশ্বাস, আর মোহনবাগানের রক্ষণে তৈরি হতে লাগল একের পর এক সমস্যা।
গোল আরও হতে পারত ইস্টবেঙ্গলের। বিজয় মুর্মুর শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। আকাশ হেমরমকে কোনওরকমে থামান মেহতাব। উত্তম হাঁসদার হেড তো বার কাঁপিয়ে ফিরে আসে। অর্থাৎ সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল তরুণ ইস্টবেঙ্গল।
এর মধ্যেই আপুইয়ার সঙ্গে সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়ে মাঠ ছাড়তে হয় মনোতোষ মাজিকে। পরিবর্ত হিসেবে বিলালকে মাঠে পাঠান ইস্টবেঙ্গলের কোচ অর্চিষ্মান বিশ্বাস। আর মাঠে নেমেই যেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন বিলাল। বিজয় মুর্মুর কর্নার থেকে বিলালের দুরন্ত হেড। বল জালে। সমতায় ফিরল ইস্টবেঙ্গল।
যে ইস্টবেঙ্গলকে প্রথমার্ধে মনে হচ্ছিল অনেকটাই কোণঠাসা, দ্বিতীয়ার্ধে সেই দলটাই যেন বাঁধ ভেঙে ছুটে চলা নদী। একের পর এক আক্রমণে মোহনবাগানের রক্ষণকে ব্যস্ত করে তুলল তারা। আকাশ হেমরমের গতি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। বারবার তাঁর দৌড়ে সমস্যায় পড়ছিল সবুজ-মেরুন রক্ষণ।
অন্যদিকে ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণেও নজর কেড়েছেন অঙ্কন ভট্টাচার্য। প্রথমার্ধে মনবীরের গোলের সময় ভুল করলেও পরের দিকে একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে সামলেছেন তিনি। শেষের দিকেও গৌরব বাঁচান দলকে। শেষ পর্যন্ত আর কোনও গোল হয়নি। কলকাতা লিগের ডার্বি শেষ হল অমীমাংসিতভাবে।
তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় বার্তা হয়তো স্কোরলাইনের বাইরেই। মোহনবাগানের দলে ছিল আইএসএল খেলা একাধিক অভিজ্ঞ ফুটবলার। অভিজ্ঞতার দিক থেকে সবুজ-মেরুন অনেকটাই এগিয়ে ছিল। বিপরীতে ইস্টবেঙ্গলকে ভরসা করতে হয়েছিল তরুণদের উপর।
কিন্তু সেই তরুণরাই দেখিয়ে দিল, ফুটবলে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, লড়াই করার ইচ্ছা, আত্মবিশ্বাস আর জেদও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তারকাখচিত মোহনবাগানকে আটকে দিয়ে বারাসতের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের তরুণ ব্রিগেড তাই হয়তো জয় পায়নি, কিন্তু মন জিতে নিয়েছে। মানসিক দিক থেকে জয় কিন্তু ইস্টবেঙ্গলেরই। এখনও পর্যন্ত লিগে ইস্টবেঙ্গল অপরাজিত। আইএসএলের খেলোয়াড় সমৃদ্ধ মোহনবাগানও পারল না ইস্টবেঙ্গলকে থামাতে।