মিরিকে অবরুদ্ধ রংভং নদী থেকে জল বার করার কাজ শুরু, সিকিমে স্বাভাবিকের পথে তিস্তা
প্রতিদিন | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভূমিধসে অবরুদ্ধ মিরিক পাহাড়ের রংভাং নদীতে তৈরি গভীর হ্রদ ঘিরে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে সাধারণ মহলে। ভারী বৃষ্টি হলে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কায় প্রশাসনের তরফেও পাহাড়-সমতলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হ্রদে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ জল কীভাবে নিরাপদে বের করা যায়? তাই নিয়ে কাজ শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তিস্তার ঘোলা জল সমতলে নামতে শুরু করেছে।
মিরিক বস্তি-২ এলাকায় পাহাড়ের বিরাট এলাকা ধসে রংভাং নদীর স্বাভাবিক গতিপথ অবরুদ্ধ করে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাঙ্গারজং চা বাগান, লোয়ার পালজারগাঁও এবং মিরিক বস্তি-২ এলাকা। লাবারবোটায় লোয়ার পালজার গাঁও-এর ৩৩টি পরিবারের ১২৪ জন ভিটেমাটি হারিয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। ভূমিধসের ফলে রংভাং নদীতে প্রচুর পরিমাণে মাটি, পাথর নেমে তৈরি হয়েছে প্রায় ৭০ মিটার চওড়া এবং ৩ মিটার গভীর কৃত্রিম হ্রদ।
ওই নদী সমতলে শিলিগুড়িতে বালাসন নদীর সঙ্গে মিলেছে। স্বভাবতই উদ্বেগে দিন কাটছে নামসু, রংভাং, দুধিয়া ও তরাই এলাকার বাসিন্দাদের। যদিও নদী বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভারী বৃষ্টিতে যদি কৃত্রিম হ্রদ ভেঙেও যায় তবুও নেপালের মতো হড়পা বানের তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে প্লাবনের ধাক্কা সামলাতে হবে। ভূগোলের গবেষক তথা চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ মধুসূদন কর্মকার বলেন, “এটা হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ নয়। রংভাং নদী সিঙ্গালিলা রেঞ্জের দক্ষিণ অংশে মাজুয়া বস্তিতে উৎপন্ন হয়ে নিচে নেমে বালাসন নদীতে মিশেছে। এই নদীর জল ধারণ ক্ষমতাও অনেক কম। তাই বিধ্বংসী হড়পা বানের সম্ভাবনা নেই।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, পাইলা গাঁও পাহাড়ের ঢালে ভূমিধস শুরু হয় বুধবার রাতে। শুক্রবার বিরাট এলাকা ধসে নিচে নদীতে নামে। পাইলা গাঁও স্কুল দারা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান কিসমত সুব্বা জানান, তাদের বাড়ি থেকে ৭০০ মিটার নিচে ভূমিধসটি হয়েছে। বুধবার সেটির সূত্রপাত। শনিবারও কিছু এলাকা ধসেছে। মাটি ও পাথর গড়িয়ে নেমে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ অবরুদ্ধ করেছে। সেখানে প্রচুর জল জমেছে।
গত বছর অক্টোবর মাসে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সিকিম, দার্জিলিং, কালিম্পং। প্রবল বৃষ্টিতে দার্জিলিং পাহাড়ের একাধিক জায়গা ভূমিধসে বিধ্বস্ত হয়। মিরিক ও সুখিয়াপোখরি এলাকায় কয়েকজনের মৃত্যুও ঘটে। মৃতদের মধ্যে ছিল কয়েকজন শিশু। শিলিগুড়ি থেকে পাহাড়ে যাওয়ার পথে রোহিনী রোডে ব্যাপক ধস নামে। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কের কার্সিয়ং-এর হুইটসেল খোলার রাস্তা ভূমিধসে বিধ্বস্ত হয়। যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিলিগুড়ি থেকে মিরিক যাওয়ার রাস্তায় দুধিয়া সেতু ভেঙে যায়। ফের কি এবার আবার দুর্যোগের কবলে পড়বে দার্জিলিং?
সাংসদ রাজু বিস্তা এবং কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক সোনাম লামা জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে উদ্ধারকাজে গতি আনার নির্দেশ দিয়েছেন। মিরিক থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের নদী সংলগ্ন এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কৃত্রিম হ্রদে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ জল কীভাবে নিরাপদে বার করা যায়? সেই কাজ শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নদী বিশেষজ্ঞ এবং ইঞ্জিনিয়ারদের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। জলাধারের পাড়ের স্থিতিশীলতা, নদীর প্রবাহ এবং ধসের সম্ভাব্য নতুন জায়গাগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দার্জিলিংয়ের জেলাশাসক হরিকৃষ্ণ পানিক্কর জানিয়েছেন, হ্রদ লাগোয়া এলাকা থেকে ৩৩টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং বিশেষজ্ঞদের দল পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। পাহাড়ের পরিস্থিতি নজরে রেখেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও। দুর্যোগ এলাকা থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করে পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ দিচ্ছেন সাংসদ রাজু বিস্তা। তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। আমরা ধস এলাকা থেকে তাঁকে অন-গ্রাউন্ড পরিস্থিতির সমস্ত বিবরণ দিয়েছি।” এদিকে উত্তর সিকিমে ভূমিধসের জেরে তিস্তা ও চ্যাকুং নদীপথ অবরুদ্ধ হয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরির ফলে যে বিপদ গর্জেছিল, সেটাও অনেকটা কমেছে। সমতলে সোমবার তিস্তার জলস্তর নেমেছে। তবে এখনও ঘোলা জল বইছে। সর্তকতাও বহাল রেখেছে প্রশাসন।