• ‘রাতে চেঁচামেচি করবেন না’, হইচই থামাতে গিয়ে আক্রান্ত, দিল্লিতে মণিপুরের সঙ্গীতশিল্পীকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ
    এই সময় | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • বাড়ির বাইরে মদ্যপদের চিৎকার, ধাবার কর্মীদের হইচই লেগেই থাকত। বিরক্ত হয়ে আস্তে কথা বলতে বলেছিলেন মণিপুরের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী চংথাং বিক্রম সিং (৫৪)। তাতেই রাগে তাঁকে বেদম মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। রবিবার মাঝরাতে দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির কিলোকরি গ্রামের ঘটনা। গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় চংথাংকে। সোমবার সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। মারধরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখনও পর্যন্ত আট জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে একজন নাবালক।

    চংথাং বিক্রম সিং হলেন মণিপুরের বিখ্যাত গায়ক চংথাম কমলার ছেলে। বিক্রম নিজেও ওয়েস্টার্ন মিউজিকের পরিচিত মুখ। মূলত গিটারিস্ট। Ultra Vires, Phoenix এবং Eastern Dark-এর মতো ব্যান্ডের সঙ্গে গিটার বাজিয়েছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে দিল্লির কিলোকরি গ্রামেই থাকতেন তিনি। তাঁর বাড়ির উল্টোদিকেই ছিল একটা ধাবা। রাত বাড়লেই সেখানে হট্টগোল শুরু হতো বলে অভিযোগ। কয়েক জন মদ্যপ যুবকের চিৎকার চেঁচামেচিতে শান্তির দফারফা হয়ে যেত বলে অভিযোগ।

    গতকাল (রবিবার) মাঝরাতে ফের হট্টগোল শুরু হয়। বিরক্ত হয়ে নীচে যান চংথাং। যুবকদের সাফ জানিয়ে দেন, আস্তে কথা বলতে হবে। রাতদুপুরে বাড়ির সামনে এত চিৎকার চেঁচামেচি যেন না হয়। এখান থেকেই কথা কাটাকাটির শুরু। বচসার মাঝে আচমকাই এক যুবক তাঁকে সজোরে ঘুষি মারেন বলে অভিযোগ। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন আরও কয়েক জন। অভিযোগ, রাস্তায় ফেলে চংথাংকে এলোপাথাড়ি মারধর করেন তাঁরা। অবস্থা বেগতিক দেখে সানলাইট কলোনি থানার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করেন সঙ্গীতশিল্পীর বাড়ির লোকজন।

    কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলে হাজির হয় পুলিশ। তাঁরাই চংথাংকে উদ্ধার করেন। পুলিশ এবং ছেলে ইয়াইফাবা মিলে গুরুতর জখম চংথাংকে নিয়ে যান হোলি ফ্যামিলি হসপিটালে। সেখানেই তাঁর চিকিৎসা চলছিল। সোমবার হাসপাতালেই মৃত্যু হয় তাঁর। এর পরেই সানলাইট কলোনি থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(২)/৩(৫) ধারায় এফআইআর দায়ের করে তাঁর পরিবার।

    তদন্তে নেমে এখনও পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন নাবালক। তবে তাঁদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির ডেপুটি কমিশনার বিনীত কুমার বলেন, ‘মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে দিল্লি এইমসে মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

    মৃত সঙ্গীতশিল্পীর পরিবারের দাবি, এলাকায় বেশ কয়েক দিন ধরেই গোলমাল চলছিল। পরিবারের এক সদস্যের অভিযোগ, কয়েক জন যুবক মদ্যপ অবস্থায় নিয়মিত চিৎকার-চেঁচামেচি করত। চংথাং আগেও তাঁদের বারণ করেছিলেন। রবিবার মাঝরাতে সেই গোলমাল থামাতেই বেরিয়েছিলেন তিনি। তখনই চংথাংয়ের উপরে হামলা হয় বলে দাবি তাঁদের।

    ঘটনার খবর সামনে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দিল্লির মণিপুরি সম্প্রদায়ের লোকজন। সানলাইট কলোনি থানার সামনে বিক্ষোভও দেখান বিভিন্ন মণিপুরি সংগঠন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ তদন্ত করতে হবে। সঙ্গীতশিল্পীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস সোসাইটিও (NESSDU)। দিল্লির মণিপুরি সমাজকর্মী লিলি বলেন, ‘আমরা বিক্রমের ন্যায় বিচার চাই। দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

    চংথাংয়ের মৃত্যুতে রাজধানীতে বসবাসকারী উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে সঙ্গীতশিল্পীর উপরে হামলার নেপথ্যে কোনও জাতিগত বিদ্বেষ ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে চলতি বছরে দিল্লিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের উপর হামলা, হেনস্থা এবং বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্যের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।

    গত মার্চে সাকেত আদালতের কাছে মণিপুরের এক মহিলাকে কটূক্তির অভিযোগে চার নাবালককে আটক করা হয়েছিল। ওই মাসেই মালব্য নগরে মণিপুরের এক মহিলাকে হেনস্থা করার অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনা রিপোর্ট তলব করে NHRC। মে-তে নেহরু প্লেসে দুই মহিলাকে শ্লীলতাহানি ও মারধরের অভিযোগে চার জনকে আটক করা হয়। অগস্টে মুনিরকায় মণিপুরের দুই যুবককে মারধরের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে চংথাংয়ের মৃত্যু নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

  • Link to this news (এই সময়)