এই সময়, মালদা: আশঙ্কাই সত্যি হলো। বাঁধ ভেঙে হু হু করে গঙ্গার জল ঢুকতেই তলিয়ে গেল অসংখ্য ঘরবাড়ি। মালদার ভুতনিতে পুনরায় সৃষ্টি হলো বন্যা পরিস্থিতির। জলের তলায় ভূতনি থানা। পরিস্থিতি এমনই যে, একটি হাইস্কুলের সাতটি ঘরে অন্তত ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে করে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, মহিলা-সহ প্রায় ৩০০ জন বর্তমানে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন ইংরেজবাজার ব্লকের মিলকি গ্রাম পঞ্চায়েতের খাসকোল হাইস্কুলে।
সোমবার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ওই স্কুলে যেতেই হতবাক হয়ে যান প্রশাসনের আধিকারিকরা। এ দিন ওই স্কুলে যান মানিকচকের বিজেপি বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডলও। তিনি বলেন, 'এই স্কুলে গাদাগাদি করে থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। আশপাশের স্কুলগুলিতে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থানান্তরিত করা হচ্ছে।' এ দিকে, ভুতনি থানা জলের তলায় চলে যাওয়ায় অস্থায়ী ভাবে ভূতনি ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে থানা পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিং। ইতিমধ্যে ভূতনি থানার অন্তর্গত উত্তর ও দক্ষিণ চণ্ডীপুর এলাকা এবং হিরাননন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় ২০০ পরিবার বন্যা পরিস্থিতির শিকার। তাঁরা বিভিন্ন স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন।
এ দিকে, সেচ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু এবং মানিকচকের বিধায়ক বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। সূত্রের খবর, মালদার জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর ইতিমধ্যেই ভুতনির প্লাবন-পরিস্থিতির বিষয়ে রাজ্য সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ভুতনির বন্যা পরিস্থিতি সরজমিনে খতিয়ে দেখতে শিগগিরই মালদায় আসতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে এই সফর সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বিশদে তথ্য মেলেনি।
খাসকোল এলাকায় নদী-ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত রবিউল শেখ, মর্জিনা বিবি, আখতারুল শেখরা খাসকোল হাইস্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা জানান, প্রায় ১৫ দিন ধরে বিক্ষিপ্ত ভাবে গঙ্গার পাড় ভাঙছে। রবিদাসপাড়া, মণ্ডলপাড়া, কাশিপাড়া এবং শেখপাড়ায় ভাঙনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। একাধিক বাড়ি গঙ্গায় তলিয়ে গিয়েছে। আতঙ্কে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরিয়ে স্কুলের ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে একবেলা খিচুড়ি, অন্যবেলা ডিম-ভাত খেয়ে কোনওমতে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, প্রায় ৩০০ মানুষ অনেক কষ্টে মাত্র সাতটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। বাকি ঘরগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে কেন, এই প্রশ্ন তুলেছেন রবিউলরা। এ ছাড়াও স্কুলে শৌচাগারের দুরবস্থা, পানীয় জলের অভাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে তাঁদের। বিধায়ককে তাঁরা সবটা জানিয়েছেন। গৌড়চন্দ্র বলেন, 'ত্রাণ সামগ্রীর অভাব নেই। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য মডেল ভিলেজ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।'
ভূতনি থানার কার্তিকটোলা, পুলিনটোলা, গিরিধারীটোলা, কেশরপুর, কালুটনটোলা, বসন্তটোলা এলাকাতেও হু হু করে গঙ্গার জল ঢুকেছে। প্লাবনের আশঙ্কায় অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। ভূতনি থানার প্রায় ৪০টি এলাকায় চাষের জমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। রাস্তাঘাটও জলমগ্ন। মানিকচক থেকে ভুতনির সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন। ভূতনি ব্রিজ পেরিয়ে এক কিলোমিটার মতো যাওয়ার পরে রাস্তা দিয়ে গঙ্গার জল বইছে। ফলে সে পথ দিয়ে গাড়ি, মোটরবাইক চলাফেরা করতে পারছে না। মানুষের হেঁটে যাওয়ার তো কোনও কথাই নেই। প্রশাসনের তরফে স্থানীয়দের জন্য কিছু ছোট নৌকা দেওয়া হয়েছে চলাফেরা করার জন্য।
পুরো বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী জোয়েল বলেন, 'বন্যা পরিস্থিতি এবং ভাঙনের বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। প্রশাসনের তরফে সবরকম সহযোগিতা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি যেমন ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছে, একই ভাবে গবাদি পশুদের জন্যও আলাদা করে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।'