বুদ্ধদেব বেরা, ঝাড়গ্রাম
প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে বাল্যবিবাহ হচ্ছে। কারও চুপিসারে অনেক ছাত্রীর বাড়ি থেকে বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। কেউ আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয়-প্রণয় থেকে সটান ঝাঁপ দিচ্ছে পরিণয়ে। প্রায় জেলার কোথাও না কোথাও থেকে প্রশাসনের কর্তাদের কাছে উঠে আসছে এমন তথ্য। নাগাড়ে সচেতনতার কাজ চললেও এ বার অভিনব পদক্ষেপ করতে চলেছে ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসন।
স্কুল পড়ুয়াদের সঠিক পথ দেখাতে নেওয়া হবে 'প্রজ্ঞা দিদির' সাহায্য। জেলার স্কুলগুলো থেকে একজন করে 'প্রজ্ঞা দিদি' বেছে নিয়ে ব্যাজ দেবে প্রশাসন। তারাই সহপাঠীদের মনের কথা জানবে ও তেমন 'বিপদ'-এর ইঙ্গিত পেলে প্রশাসনকে খবর দেবে। ডিএম, এসডিও, বিডিও, পুলিশ- কারও সঙ্গে দেখা করার জন্য 'প্রজ্ঞা দিদি'কে কোনও অ্যাপয়ন্টমেন্ট নিতে হবে না। তারা ব্যাজ দেখিয়ে সরাসরি পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে।
প্রজ্ঞা কথার অর্থ অভিজ্ঞ বা বুদ্ধিমান। স্কুল কর্তৃপক্ষ তিন জন ছাত্রীকে বেছে নেবেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রশাসনের কর্তারা ঠিক করবে, কে হবে 'প্রজ্ঞা দিদি'। স্কুলের অন্য ছাত্রীদের মনের কথা জানার দায়িত্ব দেওয়া হবে তাকেই। ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলাশাসকের কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আগামী ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হওয়ার কথা। ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর বলছেন, 'অনেক ছাত্রীই তাদের সমস্যার কথা, মনের কথা বাড়িতে জানাতে পারে না। বলতে পারে না শিক্ষকদেরও। তারা বন্ধুদের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে। এ ক্ষেত্রে 'প্রজ্ঞা দিদি' বিষয়টি অনায়াসে জানতে পারবে। তেমন খারাপ কিছু টের পেলে তারাই খবর পৌঁছে দেবে প্রশাসনের কর্তাদের কাছে।' জেলাশাসক জানান, এ ছাড়াও স্কুলে আসার পথে বা পাড়ার মোড়ে ছাত্রীদের কেউ উত্ত্যক্ত করলে, অর্থাভাবে কারও পড়াশোনা আটকে গেলে, পরিবারের তরফে স্কুলে আসতে বাধা দেওয়ার বিষয়গুলোও 'প্রজ্ঞা দিদি'রা প্রশাসনকে জানাবে।
প্রশাসন সূত্রের খবর, ছাত্রীদের স্কুলমুখী করতে সরকারের একাধিক প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু তারপরেও দেখা যাচ্ছে স্কুলছুট বাড়ছে। স্কুলছুট রুখতে ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করতেই এমন পদক্ষেপ করছেন জেলাশাসক। আগামী দিনে ছাত্রীদের স্বনির্ভর করতেও বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা পেতেও ছাত্রীদের সহযোগিতা করবে 'প্রজ্ঞা দিদি'রা। প্রথম পর্যায়ে গার্লস ও কো-এড স্কুলে এই প্রকল্প চালু করা হবে। পরে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু করার ভাবনাচিন্তা রয়েছে। জেলাশাসক বলেন, 'প্রশাসন ও ছাত্রীদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজটিই করবে 'প্রজ্ঞা দিদি'।'
পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির বেশ কয়েক জন ছাত্রীকে নিয়ে ১৫ জনের একটি বিশেষ দল গঠন করা হবে। সেই দলে অভিজ্ঞ ও সকলের সঙ্গে মিশতে পারার ক্ষমতা রয়েছে এমন ছাত্রীকে স্কুল কর্তৃপক্ষের সুপারিশে 'প্রজ্ঞা দিদি'র দায়িত্ব দেওয়া হবে। 'প্রজ্ঞা দিদি'র দলে ১৫ জন ছাত্রী থাকবে। স্কুলের একজন শিক্ষিকা ও প্রধান শিক্ষিকাকেও ওই দলের সদস্য করা হবে। প্রতি মাসে ওই দলের সঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা মিটিং করবেন। ছাত্রীদের মন থেকে পুলিশ-প্রশাসনের ভীতি দূর করতে থানা, আদালত, বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তরে ঘোরানো হবে। সেখানে গিয়ে তারা দেখবে, কী ভাবে প্রশাসনিক দপ্তরে কাজ হয়। ঝাড়গ্রাম ননীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অরুন্ধতী সেনের কথায়, 'অত্যন্ত ভালো পদক্ষেপ করছে জেলা প্রশাসন। এর ফলে ছাত্রীদের বাল্যবিবাহ ও স্কুলছুট রুখে দেওয়া যাবে।' দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী অম্বালিকা মুর্মু বলছে, 'আগামী দিনে 'প্রজ্ঞা দিদি'রাই ছাত্রীদের আত্মরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠবে।'