এই সময়: কিশোরী মা যে বাল্যবিবাহেরই ফসল— তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নাবালিকা মাতৃত্ব এবং বাল্যবিবাহ— এই দুই ক্ষেত্রেই রাজ্য এখন এক নম্বরে। সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে এই তথ্য জানিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকা মাতৃত্ব রুখতে এ বার কড়া আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চলেছে রাজ্য সরকার। দোষীদের বিরুদ্ধে পকসো এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হবে। পাশাপাশি, তাঁদের সব রকম সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এ দিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষাতে আমরা সারা দেশে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। এখন আমরা দুটো বিষয়ে ভারতবর্ষে প্রথম। সবই বিগত সরকারের কুফল। একটা হচ্ছে ১৮ বছরের নীচে বিবাহ এবং আর একটা হলো ওই বয়সেই সন্তান প্রসব।’ মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন— এই ছ’মাসে রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার নাবালিকা-মাতৃত্বের ঘটনা সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ। সেখানে নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা ১২,৮৪৭। এর পরেই রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৪,১৭৮), পূর্ব বর্ধমান (৩,৭৭৭) ও মালদা (৩,৭৪৩)।
স্বাস্থ্য দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সবক’টিই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব। অর্থাৎ প্রসব হয়েছে হাসপাতালে। সেই সূত্রেই স্বাস্থ্য দপ্তর এই পরিসংখ্যান সঙ্কলন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যে এই নাবালিকাদের স্বামীদের স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে শো–কজ় নোটিস পাঠানো শুরু হয়েছে। এক মাসের মধ্যে ওই দম্পতিদের বয়সের প্রমাণ দিতে হবে। বিয়ে এবং প্রসবকালে স্ত্রীর বয়স অন্তত ১৮ এবং স্বামীর ২১ বছর না হলে কড়া আইনি পদক্ষেপ করবে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘প্রমাণ যদি না করেন, ডিজিপি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী পদক্ষেপ করবেন।’
বাল্যবিবাহ রোধে ২০০৬–এর আইন এবং পকসো আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, শুধু স্বামী নন, বিয়েতে মদতদাতা পুরোহিত বা কাজি, বাবা-মা— কাউকেই রেয়াত করা হবে না। পকসো আইনের ৪ এবং ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এমনকী মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তাঁর কথায়, ‘যারা (স্বামী) ১৮ বছরের নীচের কাউকে বিয়ে করেছে এবং কিশোরী স্ত্রীয়ের টিন–এজ ডেলিভারি হয়েছে, তাঁরা প্রথমে পকসো আইনে জেলে চলে যাবেন। আপাতত আমরা শো–কজ় করেছি৷ পরে সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করব আমরা। রাস্তায় গড়াগড়ি খেলেও পাবেন না।’
শুভেন্দু জানান, বয়স প্রমাণের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্রের তথ্যে অসঙ্গতি ধরা পড়লে স্কুল সার্টিফিকেট বা অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখা হবে। ধর্ম বা জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে এই পদক্ষেপ হবে বলে তিনি জানান। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের৷ নজিরবিহীন এই সংখ্যা দেখে খোদ মুখ্যমন্ত্রী আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘আমাদের রাজ্যে এত জেলও নেই। সবচেয়ে বড় জেল বহরমপুর, সেখানে ১,৭০০ জন থাকতে পারে৷ আমরা নাবালিকা মায়েদের যে হিসেব দিলাম সেটা মাত্র ছ’মাসের! এর আগে-পরের হিসেব নিলে কী হবে!’
স্বাস্থ্যকর্তারা বলছেন, বিগত সরকারের আমলেও যে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একেবারে কোনও চেষ্টা হয়নি, এমনটা নয়। তৃণমূল জমানায় স্কুলছুটের পাশাপাশি নাবালিকা বিয়ে ঠেকাতে কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু হয়েছিল। যাতে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ— এই চার বছরে ১ হাজার টাকা করে মিলত। আর স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির সময়ে ফের দু’বার ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, এতে স্কুলছুটের হার কিছুটা কমলেও বাল্যবিবাহের ভয়াবহ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। উল্টে কোভিড অতিমারী পর্বের পরে পশ্চিমবঙ্গে বেড়ে গিয়েছে বাল্যবিবাহের হার। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, এর নেপথ্যে রয়েছে আর্থ–সামাজিক দুরবস্থা, যার জেরে কোনও রকমে কিশোরী মেয়েকে পাত্রস্থ করেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন অনেক গরিব মা–বাবা!
ফলে, বেশ কয়েক বছর ধরে অন্যান্য স্বাস্থ্য-সূচকে উন্নতির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে প্রথম সারিতে থাকলেও, এই একটি বিষয়ে বাংলার স্থান সবচেয়ে খারাপ রাজ্যগুলোর মধ্যে উপরের সারিতেই রয়েছে ধারাবাহিক ভাবে। ২০১৯-এর পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (এনএফইচএস-৫) তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি ১৬.৪% কিশোরী ইতিমধ্যেই মা হয়েছেন অথবা সমীক্ষার সময়ে প্রথম সন্তান গর্ভে ধরেছেন। ২০২৪-এ ওই একই সমীক্ষার ষষ্ঠ সংস্করণে দেখা গিয়েছে, এই হারে দেশের প্রথম পাঁচে থাকা রাজ্যগুলির চারটির অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেও, পশ্চিমবঙ্গে (১৬.৬%) হয়েছে অবনতি। তখনও পর্যন্ত সারা দেশে নাবালিকা মাতৃত্বে এক নম্বরে ছিল ত্রিপুরা, দুইয়ে বাংলা। কিন্তু এই দু’বছরের মধ্যেই বাংলা প্রথম স্থানে উঠে এসেছে বলে খবর সরকারি সূত্রে।