• দিল্লির সত্য নিকেতনে বহুতল ধসে দায় কার? ভর্ৎসনা আদালতের
    এই সময় | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: বিল্ডিং মালিক, দিল্লি পুরসভা নাকি প্রশাসন— রাজধানীর সত্য নিকেতন এলাকায় বাড়ি ভেঙে পড়ুয়াদের প্রাণ যাওয়ার ঘটনায় দায় কার? এই নিয়েই সোমবার সরগরম রাজনীতি থেকে আদালত। রবিবার দুপুর দেড়টা নাগাদ সত্য নিকেতন এলাকার ‘হস্টেল ডেজ়’ নামে ছ’তলা বিল্ডিংটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। ছেলেদের পিজি হস্টেলের ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়েন অনেকে।

    ২৪ ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় দমকল জানায়, ১২ জনকে উদ্ধার করা গিয়েছে, যার মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে সাত জনের। ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ চাপা পড়ে নেই বলেই জানান দমকলকর্মীরা। প্রায় ২৫ ঘণ্টা তল্লাশির পরে বিল্ডিংয়ের মালিক হরিরাম বনসলকেও সোমবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজস্থানের ভিওয়াড়ি থেকে। তদন্তের সূত্রে হরিরামের স্ত্রী ঊর্মিলা এবং ছেলে মহেশ বনসলকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ। স্ল্যাবের নীচে কেউ জীবিত অবস্থায় চাপা পড়ে রয়েছে কি না, সেটা বোঝাই উদ্ধারকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তাই বড় আর্থ মুভার ব্যবহার করতে পারেননি তাঁরা।

    ড্রিলিং মেশিনের মতো ছোট ছোট যন্ত্র ব্যবহার করে কংক্রিটের জাল সরাতে অনেকটা সময় লেগেছে। প্রাথমিক তদন্ত বলছে, বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে খোঁড়াখুড়ির কাজ চালাতে গিয়ে একটি পিলার ভেঙেই পুরো বাড়িটা ধসে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, প্রবল বৃষ্টির কারণে বেসমেন্টে দীর্ঘদিন জল জমে থাকায় বিল্ডিংয়ের ভিত এমনিতেই দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই বাড়িটির ভিত দুর্বল হওয়ার পরেও কেন নোটিস পাঠাল না দিল্লি পুরসভা? উঠছে প্রশ্ন।

    দিল্লি পুরসভা অবশ্য সোমবার তাদের পাঁচ আধিকারিক— ডেপুটি কমিশনার রাকেশ কুমার, সুপারিন্টেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার রণবীর সিং, এগজ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার ললিত কুমার গোয়েল, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার সুনীল চৌহান এবং জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার আশিস কুমারকে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেন্ড করেছে। দিল্লি পুরসভার কমিশনার সঞ্জীব খিরওয়ারের পদত্যাগের দাবিও উঠছে। খিরওয়ারের অবশ্য দাবি, ১৯৭০ সালে তৈরি বাড়িটির সুরক্ষা বা নির্মাণে ত্রুটি নিয়ে কখনও কোনও অভিযোগ আসেনি, ফলে বিল্ডিং সিল করা বা নোটিস পাঠানো হয়নি। তবে, এই যুক্তিতে চিঁড়ে ভিজছে না।

    সোমবারই পুরসভা–সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দিল্লি হাইকোর্ট। একটি জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে বিচারপতি ডিকে উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার বেঞ্চ এ দিন উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। কোনও আধিকারিকের গাফিলতির প্রমাণ মিললে কড়া পদক্ষেপের কথাও বলেছে। সেই সঙ্গে সত্য নিকেতন এলাকার সব পিজি অ্যাকোমডেশন এবং হস্টেলের তথ্য সংগ্রহ করে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরসভাকে রিপোর্ট জমার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। বাইরের রাজ্যের পড়ুয়াদের জন্য তাদের হস্টেলে কতটা জায়গা রয়েছে, সেটা জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়কেও। প্রসঙ্গত, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের খুব কাছে বলেই ভিন্‌রাজ্যের যে পড়ুয়ারা কলেজ হস্টেলে থাকার সুযোগ পান না, তাঁরা মোটা টাকা দিয়ে সত্য নিকেতন এলাকায় পিজি থাকেন।

    ওই এলাকার অধিকাংশ রেসিডেনশিয়াল বিল্ডিংয়েই পিজি সার্ভিস চলে। অধিকাংশ বিল্ডিংয়ে অগ্নি সুরক্ষাবিধির বালাই নেই। সোমবার হাইকোর্টের বক্তব্য, ‘বাড়ি ভাঙার ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক। তবে কর্তৃপক্ষ একটু সচেতন হলে এই ঘটনা রোখা যেত। এই ধরনের দুর্ঘটনায় দোষ সব সময়ে বিল্ডিং মালিকের থাকে না, দিল্লিতে প্রতিটি বিল্ডিং আইন মেনে তৈরি হওয়ার কথা, তা কেন হয়নি সে ব্যাপারে পুরসভাকে দায় নিতে হবে।’ আদালতের সংযোজন, ‘পিজি অ্যাকোমডেশনগুলো শুধু বিপজ্জনক নয়, পড়ুয়াদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। এর কারণ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত হস্টেলের অভাব। অনেক কলেজের হস্টেলই নেই। ফলে বাইরের রাজ্য থেকে আসা পড়ুয়ারা পিজি–তে থাকতে বাধ্য হন।’

    প্রসঙ্গত, ‘হস্টেল ডেজ়’–এ ১৫টি রুমে ৭৫ জন আবাসিকের থাকার ব্যবস্থা ছিল। বেড পিছু মাসে নেওয়া হতো কমপক্ষে ১২,০০০ টাকা। এই মর্মেই প্রকাশ্যে এসেছে আবাসিকদের সঙ্গে পিজি–মালিকদের একটি চুক্তিপত্র। তাতে শর্তের মধ্যেই লেখা, ‘আবাসিকের কোনও ধরনের দুর্ঘটনা, মৃত্যু বা বিপদের জন্য পিজি কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবেন না।’ তদন্তকারীদের মতে, চুক্তিপত্রেই দায় এড়ানোর সব ব্যবস্থা রেখেছেন বিল্ডিং মালিকরা। কিন্তু সুরক্ষাবিধি না মনে কী ভাবে এতদিন রমরমিয়ে চলছে পিজি অ্যাকোমডেশনগুলো? এই নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। আম আদমি পার্টি (আপ)–এর সৌরভ ভরদ্বাজ বলেন, ‘ওই এলাকায় পিজি, হস্টেল চালানোর নামে লুট চলছে। দিল্লি পুরসভা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, কারণ ওই বিল্ডিংয়ের অনেকগুলোতেই বড় বড় বিজেপি নেতার মালিকানা রয়েছে। আমাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এই বিল্ডিংয়ের প্রকৃত মালিকদের নাম প্রকাশ করুন। ‘পিজি মাফিয়া’রা ধরা পড়ুক।’ কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘দিল্লিতে তো ট্রিপল ইঞ্জিন, তা হলে সেখানে এই অনিয়ম কী করে চলে? সরকার জবাব দিক।’

  • Link to this news (এই সময়)