মায়ের মনে কু ডেকেছিল। মন বলছিল, খারাপ কিছু হবে। ছেলেকে তাই কাছছাড়া করতে চাননি। মায়ের কথা না শুনেই রাখির উৎসব কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরে গিয়েছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া অর্পিত জাজ। বিশ্ববিদ্য়ালয়ের হস্টেলে জায়গা না পাওয়া বছর ১৯ বয়সি এই তরুণের ঠিকানা হয়েছিল সত্য নিকেতনের অভিশপ্ত পিজি— হস্টেল ডেইজ়। গত রবিবার দুপুরে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে সেই বহুতল। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় সাতজনের। সেই তালিকায় রয়েছেন অর্পিতও।
মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা অর্পিত ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা আত্মা রাম সনাতন ধর্ম কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া। রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ মায়ের সঙ্গে ফোনে শেষ কথা হয়েছিল তাঁর। তার ঘণ্টাখানেক পরে দুপুর দেড়টা নাগাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে মেসবাড়ি।
ব্রেকিং নিউজ় দেখেই চমকে উঠেছিলেন অর্পিতের বাবা
খবরটা টিভিতে দেখেই বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল অর্পিতের বাবার। তড়িঘড়ি ছেলের নম্বরে ডায়াল করেন। ফোনটা তখনও বাজছিল। কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনও সাড়া মেলেনি। সময় নষ্ট না করে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন তিনি। এর মাঝেই ফোন আসে অর্পিতের বন্ধুর। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপেই সম্ভবত চাপা পড়েছেন অর্পিত।
‘মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু একটা হবে...’
ছেলের দিল্লি যাওয়ার আগে মন অশান্ত ছিল মায়ের। বারবার অর্পিতকে দিল্লি যেতে বারণ করছিলেন তিনি। রেলস্টেশনে যাওয়ার সময়ে অর্পিতের বোন হেঁচেছিলেন। তাকে অশুভ সঙ্কেত ধরে নিয়ে ট্রেনে ওঠার সময়েও বাধা দেন মা। ছেলেকে বলেছিলেন, ‘দিল্লি যেও না। আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা খারাপ হবে।’ কিন্তু অর্পিতের দিল্লি ফেরাটা জরুরি ছিল। টিকিট কনফার্ম হয়ে গিয়েছিল, সামনে কলেজের ক্লাসও শুরু হওয়ার কথা। তাই মায়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে, হাত ছাড়িয়ে ট্রেনে উঠে পড়েন তিনি।
বাড়ি ধসে পড়ার খবর পাওয়ার পর থেকে সেই কথায় বার বার মনে পড়ছে অঙ্কিতের মায়ের। ছেলের নিথর দেহ দেখার পরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। তার পর থেকেই হাসপাতালে ভর্তি অঙ্কিতের মা। জ্ঞান ফেরার পরেও মেনে নিতে পারছেন না ছেলে আর নেই। কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছেন, ‘আমি অর্পিতকে না দেখে খাব না। ও বাড়ি ফিরে নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিক।’ ছেলেকে আটকে না পাওয়ার আক্ষেপে বুকফাটা আর্তনাদ মায়ের—‘আমি কেন ওকে দিল্লি যেতে দিলাম? আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা খারাপ হবে।’
অর্পিতের শেষ স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তাঁর কর্নিয়া দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার। অঙ্কিতের বাবার কথায়, ‘ছেলে তো আর ফিরবে না, অন্তত ওর চোখ দুটো বেঁচে থাকুক।’
কলেজে যাওয়ার কথা ছিল অর্পিতের
অর্পিতের বন্ধুদের কাছেও এই মৃত্যু যেন অবিশ্বাস্য। শনিবার সন্ধ্যায় ট্রেনে ওঠার পর বন্ধু সংস্কারকে জানিয়েছিলেন, দিল্লি ফিরছেন। সংস্কারের কথায়, ‘আমরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম। অর্পিত আমার দেখা সেরা মানুষগুলির মধ্যে একজন। আমরা একই দিনে দিল্লি ফিরেছিলাম। ও বলেছিল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কনসার্টে আমরা একসঙ্গে যাব।’ কিন্তু সেই দিন আর এল না।
অর্পিতের বন্ধুরা দুর্ঘটনার খবর পেয়েই তাঁকে খুঁজতে ছুটে যান। পরে জানতে পারেন, উদ্ধার হওয়া আহতদের AIIMS-এ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা অর্পিতকে শনাক্ত করেন।
এক নিমেষে থমকে গেল সব স্বপ্ন
ছোট থেকেই মেধাবী অর্পিত B.Com পড়ার পাশাপাশি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তিনি। রাখিতে পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে, নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু জরাজীর্ণ বাড়িতে পেয়িং গেস্ট থাকতে গিয়ে কয়েক টন ধ্বংসস্তূপের নীচে অকালেই শেষ হয়ে গেল মেধাবী তরুণের সমস্ত স্বপ্ন।