• সাউথ লোনাক লেকের স্মৃতি উস্কে ‘অত্যন্ত ঝুঁকি’ ১৬ হিমবাহ-হ্রদে
    এই সময় | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    নভেম্বর হোক বা মার্চ, বরফে জমা সাদা টেবলটপের মতো হোক বা ঘন নীল জলরাশি — নর্থ সিকিমের গুরুদোংমার লেকের অপার সৌন্দর্য যে কোনও সময়েই মুগ্ধ করার মতো। তাই এই হ্রদ দেখতে আসা পর্যটকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন্তু ওই হ্রদের আপাত শান্ত জলের গভীরে প্রকৃতি যে কী খেলা খেলছে, তার খবর রাখেন না পর্যটকের দল। তবে ভূতত্ত্ববিদরা অন্য কথা বলছেন।

    নেপালের বিপর্যয়ের পরে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা কাশ্মীর থেকে শুরু করে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যের হিমবাহ হ্রদগুলির উপরে নজরদারি বাড়িয়েছেন। সিকিমের ৪০০-রও বেশি হিমবাহ-হ্রদের মধ্যে ১৬টিকে ইতিমধ্যেই 'অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছে ন্যাশনাল ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিএমএ)। এর মধ্যে ১৩টি হ্রদ উত্তর সিকিমে এবং তিনটি পশ্চিম সিকিমে। এই হ্রদগুলির তালিকায় নাম রয়েছে বাঙালি পর্যটকদের অত্যন্ত পছন্দের গুরুদোংমার লেকগুচ্ছেরও। এ ছাড়াও নর্থ সিকিমের লাচেন ও লাচুং হ্রদও 'বিপজ্জনক' তালিকায় রয়েছে।

    হিমালয়ের উচ্চতর এলাকায় জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির দ্রুত পরিবর্তনের পাশাপাশি সম্প্রতি যে ভাবে হিমবাহ-জনিত বিপর্যয় বাড়ছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই হ্রদগুলির উপরে নজরদারি আরও জোরদার করেছে সিকিম প্রশাসন। 'অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ' তালিকার এই ১৬টি হ্রদ হলো টিকিপ, ভালাই পোখরি, দুধ পোখরি, চ্যাংসাং, নর্থ লোনাক, সাউথ লোনাক, লাচেন খাংসে, লাচুং খাংসে, লা ছো, শাকো ছো, ইউলহে খাংসে, গুরুদোংমার–এ, গুরুদোংমার–বি, গুরুদোংমার-সি, খাংচুং ছো এবং টেনচুংকা হ্রদ।

    ভূতত্ত্ববিদরা জানাচ্ছেন, সিকিমের এই ১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদের কোনওটিরই চিনের সঙ্গে সরাসরি জল-সংযোগ নেই। সবক'টিই ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থিত এবং এরা সিকিমের নদী ব্যবস্থায় জল নিষ্কাশন করে। সীমান্ত সংক্রান্ত বিপদের আশঙ্কা না থাকলেও এই হ্রদগুলির সম্ভাব্য বিপর্যয়ের অভিঘাত যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে ২০২৩–এর সাউথ লোনাক বিপর্যয়।

    সপ্তাহ দুয়েক আগের নেপালের বিধ্বংসী হড়পা বানের পরে আগামী দিনের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা গ্লফ) থেকে চারটি হিমবাহ হ্রদের জলস্তর কমানোর উদ্যোগ ইতিমধ্যে নিয়েছে নেপাল প্রশাসন। এর জন্য 'গ্লফ সঞ্জীবনী' নামে একটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন একই পথে হাঁটছে সিকিম সরকারও।

    সিকিমে ২০২৩–এর অক্টোবরে সাউথ লোনাক হ্রদ থেকে আচমকা বিপুল জল বেরিয়ে এসে তিস্তা অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা হয়। জলের সঙ্গে নেমে আসে পাথর ও বিপুল পরিমাণ পলি। অনেক দূরের রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ওই বিপর্যয়ই বদলে দিয়েছে সিকিমের হিমবাহ-ঝুঁকি মোকাবিলার পদ্ধতি। এখন শুধু হ্রদে কতটা জল রয়েছে, তা নয়—হ্রদের চারপাশের হিমবাহ, হিমবাহের বাঁধ বা মোরেন, পার্শ্ববর্তী ঢাল, তুষারধস ও ভূমিধসের সম্ভাবনা এবং নীচের উপত্যকায় বন্যার গতিপথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি হ্রদের মধ্যে ১৩টির বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ইতিমধ্যেই হয়েছে। তবে ১৭ হাজার ফুট বা তারও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত কয়েকটি হ্রদে সমীক্ষা চালা‍নো অত্যন্ত কঠিন। 'বাথিমেট্রিক' সমীক্ষায় হ্রদের গভীরতা ও জলধারণ ক্ষমতা মাপা হচ্ছে। ইলেকট্রিক্যাল রেজ়িস্টিভিটি টমোগ্রাফি-সহ বিভিন্ন ভূ-পদার্থবিদ্যার প্রযুক্তিতে মোরেনের ভিতরের গঠন ও স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকারি হিসেবে, সমীক্ষা করা হ্রদগুলির মধ্যে বৃহত্তমটির জলধারণ ক্ষমতা প্রায় সাত কোটি ঘনমিটার। প্রতিটি হ্রদের জন্য একই ধরনের সমাধান নয়, বরং ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী পৃথক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ছাঙ্গু থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের শাকো চু হ্রদে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প বসিয়ে জলস্তর ২০-৪০ মিটার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ২.৭ কোটি ঘনমিটার জলধারণকারী এই হ্রদের মোরেন অত্যন্ত ভঙ্গুর ও জলভেদ্য হওয়ায় বাঁধ কেটে জল বার করার পরিবর্তে আটটি সৌরচালিত পাম্পে প্রায় ৮০ লক্ষ ঘনমিটার জল সরানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

    লোনাক হ্রদগুচ্ছের ক্ষেত্রে নজর দেওয়া হচ্ছে প্রায় ডোলমা স্যাম্পাং এলাকায়। ২০২৩-এর বন্যায় প্রাকৃতিক ভাবে জল ও পলির গতি কমিয়ে দেওয়া প্রায় ৩০০ হেক্টরের এই সমতল এলাকাকে আরও কার্যকর বাফার হিসেবে গড়ে তুলতে পাথরের কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। গুরুদোংমার হ্রদগুচ্ছের তিনটি হ্রদের ক্ষেত্রেও মোরেন-সুরক্ষা দেওয়ালের কথা ভাবা হচ্ছে। এর পাশাপাশি চলছে সেন্সর-নির্ভর নজরদারি। অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদে জলস্তর ও জলভাণ্ডারের পরিবর্তন মাপতে সেন্সর বসানো হয়েছে। উত্তর সিকিমে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। শাকো চু, কেরাং ও ডোলমা স্যাম্পাংয়ে নজরদারি কেন্দ্র কাজ করছে। ডপলার রেডার বসানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    কারণ বিপদ শুধু হ্রদের জল বাড়ায় নয়। হিমবাহ ধস, তুষারধস, ভূমিধস বা আকস্মিক নদী অবরোধ—যে কোনও ঘটনাই কয়েক মিনিটে পাহাড়ি নদীকে ভয়ংকর করে তুলতে পারে। তাই সিকিমের লক্ষ্য এখন বিপর্যয়ের পরে উদ্ধার নয়, বিপর্যয়ের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে তা কমিয়ে আনা।

  • Link to this news (এই সময়)